একটা সমাজ। তাকে ঠিক কতদিক থেকে প্রভাবিত করা যায়? চিন্তা, ভাবনা, সংস্কার, মনন, শিক্ষা, বিশ্লেষণ, ধর্ম, আদর্শ, ভাষা...।

বাংলার সমাজটাকে উপরোক্ত সমস্ত দিক থেকে রসদ জুগিয়ে গেলেন যিনি, তাঁর নিজের পড়াশোনা পাঠশালাতেই শুরু, ওখানেই শেষ। অঙ্কে ধাঁধা লাগার কারণে পাঠ্যপুস্তকে ইতি। অথচ জীবনের সমস্ত জটিল ধাঁধার সমাধান করতে তাঁর দরবারেই সমাজের সর্বস্তর থেকে হুহু করে মানুষ ছুটে আসছে। ছুটে আসছেন সমাজের সমস্ত স্তরের গণ্যমান্যরা। আর তিনি সমাজের প্রতিটা বিষয়েই নতুন করে আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছেন।

এই কাজ করতে গিয়ে রামকৃষ্ণ পরমহংসকে কোনো লৌকিক রীতি নিয়ম কিচ্ছুটি ভাঙতে হয়নি। বরং সমস্ত লোকাচার অতি নিখুঁতভাবে মেনে চলেছেন নিজের জীবনে। অন্যের মধ্যেও সেই আচারের প্রতি শ্রদ্ধা জাগিয়ে তুলেছেন।

তবু তাঁকেই কিনা বলা হচ্ছে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলা নবজাগরণের পুরোধা পুরুষ।

আসলে এখানেই একটা প্রচ্ছন্ন মজা আছে। রামকৃষ্ণ পরমহংস নামের মানুষটি চলতি সমাজের কোনো কিছুই অস্বীকার করেননি। তা ভালো বা খারাপ যাই হোক না কেন, তাকে তাচ্ছিল্য করেননি। যে কোনো বিষয়কেই তাচ্ছিল্য করলে তা থেকে একটা নেতিবাচক মনোভাব এবং সেই অনুযায়ী আচরণের জন্ম হতে পারে। এতে কারো কোনো ভালো হয় না। সংস্কার করা মানে বাইরে থেকে ভেঙে দেওয়া নয়, বরং ভেতর থেকে পালটে দেওয়া। এতে কোথাও বিদ্বেষভাবের সৃষ্টি হয় না। বরং যুক্তিসিদ্ধ আদানপ্রদান তৈরি হয়।

সেই কারণেই বাইরে থেকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়া সংস্কার নিয়ে প্রবল অসন্তোষ, বাদ বিবাদ, কোথাও বা নতুন ভাবের সমূলে উৎপাটন ঘটে গেলেও রামকৃষ্ণ পরমহংসের সঙ্গে সমাজ সে কাজটা করতে পারেনি। কারণ তিনি চাপিয়ে দেননি কিছু। বরং যুক্তি দিয়ে ঠিক-ভুল নির্ণয় করে দিয়েছেন, তাও আবার ভেতর থেকে। যুক্তির সামনে মানুষের তো কোনো অন্ধত্ব চলে না।

এই যুক্তিগুলো তিনি কোনো শাস্ত্র থেকে নিয়ে আসেননি। শাস্ত্র মানেও এক অনুশাসন। শাসন অর্থে সেই চাপিয়ে দেওয়া। যার তিনি বরাবরের বিরোধী।

তাহলে যুক্তিগুলো নিয়ে এসেছেন কোথা থেকে?

উপলব্ধি থেকে। সেই কারণেই সেগুলো সবচেয়ে বেশি মৌলিক। এর আগে সে সব মৌলিকতা নিয়ে কেউ বিশেষ কিছুই বলেননি। মানুষ স্বভাবতই নতুন কথা শুনতে ভালোবাসে। রামকৃষ্ণ পরমহংসের কাছে নতুন কথা শুনতে পাওয়া যায়। নতুন জিনিস জানতে পারা যায়। নতুন কিছু শিখতে পারা যায়। অথচ এই শিক্ষা কখনোই জবরদস্তি নয়। বরং এই শিক্ষা বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

আবার শিক্ষাদানের রীতিটিও অভিনব। প্রথম কথা, তাঁর ভাষা। এমন ভাষায় কথা বলছেন, যে ভাষা একেবারে লৌকিক। কিছু পরিমাণে গ্রামীণও বটে। যেহেতু কিছুই তাঁর আরোপিত নয়, অতএব ভাষাটাও পরিমার্জন করা জরুরি মনে করেননি। বরং তাঁর নিজস্ব ছাপ তাতে এত প্রগাঢ় বলেই সে ভাষার আকর্ষণ সবচেয়ে বেশি। মানুষ যা আন্তরিকভাবে পায়, তা তার মগজ পেরিয়ে হৃদয়ে গেঁথে থাকে। এক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। এমন কথ্য এবং লৌকিক ভাষার সুবাদে রামকৃষ্ণ পরমহংসকে মানুষ নিজের খুব কাছাকাছি অনুভব করতে পেরেছে। প্রকারান্তরে এই অনুভবটাই তাঁর শিক্ষাকে শিক্ষার্থীর মনে চালান করে দিয়েছে সোজা। পাঠ্য হিসেবে অবসরের সঙ্গী হয়ে থাকেনি। বরং তাঁর নিজের কথাতেই, ‘ভাতের হাঁড়ি’ তে ফুটতে শুরু করে দিয়েছে অনায়াসে।

ভাষা যদি তাঁর গ্রহণযোগ্যতার প্রথম কারণ হয়, তাহলে পরের প্রধান কারণটি হল উপমা। সাহিত্যে উপমা বলতে মহাকবি কালীদাসের প্রসঙ্গ টানা হয়। উপমা কালীদাসস্য। অর্থাৎ তাঁর মতো উপমাকে আর কেউ সাহিত্যের অঙ্গ করে তুলতে পারেননি। কিন্তু সৈয়দ মুজতবা আলীর মতো প্রথিতযশা সাহিত্যিক মনে করেন, উপমায় রামকৃষ্ণ কালিদাসকেও টেক্কা দিয়ে গেছেন হাসতে হাসতে। আর সেই উপমার সঙ্গে আলঙ্কারিক শব্দবন্ধ কিংবা কল্পনার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং উপমাগুলো একেবারেই তাঁর নিজের জীবন, অভিজ্ঞতা, দেখা, শোনা ইত্যাদি জায়গা থেকে বাছাই করা। সেগুলোর সঙ্গে তাঁর নিজের প্রত্যক্ষ যোগাযোগ রয়েছে। সেই কারণেই উপমাগুলো অত বেশি প্রাণবন্ত, কার্যকর।

অসামান্য স্মৃতিশক্তির সুবাদে একবার কোনো জিনিস দেখলে বা শুনলে ভুলতেন না কখনো। আর বুদ্ধি এতটাই সূক্ষ্ম এবং সরস ছিল যে, ঠিক সময়ে সঠিক প্রসঙ্গের সঙ্গে ওই উপমা জুড়ে তাকে পেশ করতেন।

প্রসঙ্গটা সহজবোধ্য না হলেও ওই উপমার গুণে তা আদৃত হয়ে উঠত সব মহলেই। শুধু তাই নয়, সেই সঙ্গে তৈরি হত তার এক চিরন্তন গ্রহণযোগ্যতা।

সময় পেরিয়ে আজকেও যা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।

জাগরণের এমন পাঠ বোধহয় আর কেউ দিতে পারেননি। তাই শুধু ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ নয়, সব যুগের সমস্ত আধুনিকতার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকবেন তিনি, রামকৃষ্ণ পরমহংস।

তাঁর সেই যুগ-উত্তীর্ণ প্রভাব নিয়েই অতি মাত্রায় প্রাসঙ্গিক এবং সরস আলোচনা করেছেন স্বামী সোমেশ্বরানন্দ। এখানে শুধু ধর্ম নেই, বরং জীবনের সমস্ত পথেই পরিভ্রমণ আছে। আছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় যুক্তিও। তাই এই বই কোনো বিশেষ শ্রেণির নয়, বরং আপামরের।

 

#লোকজীবনে শ্রীরামকৃষ্ণ

স্বামী সোমেশ্বরানন্দ

শ্রদ্ধা প্রকাশনী

বিনিময় মূল্য- ১৩৫ টাকা