দেশ পত্রিকার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার কিছু দুঃখ। লেখা ফেরত পাবার যন্ত্রণা নয়। সে ক্ষমতা এখনো অর্জন করিনি। দেশে আমি লেখা পাঠাইনি। একটিমাত্র লেখা পাঠিয়েছি বর্তমান পত্রিকায়, সপ্তাহ দুয়েক আগে। আমার দুজন ভালোবাসার মানুষের তাগদায়।

তবে, দুঃখ ছিল। বিদেশবাসের সময় দীর্ঘদিন বিচ্ছেদ হয়েছিল তার সঙ্গে। কেন ? সে কথা বলে দুঃখকে আবার উসকে দিয়ে লাভ নেই। কেননা , পুরোনো দুঃখ , কবর খুঁড়ে তুলে আনা কঙ্কালের মত। কিছুই দেবেনা আবার দুঃখ ছাড়া।

বলার কথা এই যে, একটি পত্রিকার সঙ্গে বিচ্ছেদ যে শিক্ষা সংস্কৃতির মূল শুদ্ধ নাড়িয়ে দিতে পারে, তা আমার মত করে কেউ বোঝেনি।

কিছুদিন আগে শ্রদ্ধেয় প্রাবন্ধিক শ্রী অমিত্র সূদন ভট্টাচার্যের লেখা একটি প্রবন্ধ পড়ছিলাম।

প্রবন্ধটি মূলত দেশ পত্রিকার সম্পাদক সাগরময় ঘোষের ওপরে লেখা। পৃথিবীর সাময়িক পত্রের ইতিহাসে দেশ যেমন প্রথম শ্রেণীর একটি সাহিত্যপত্রিকা, সাগরময় ঘোষ তাঁর কান্ডারী হিসেবে কম বর্ণময় ছিলেন না। তিনি উৎসাহ দিতেন ছোটগল্প লেখায়। এবং তার ভালো গল্প লিখিয়ে সুযোগ পেত ধারাবাহিক উপন্যাস লেখার। সেই ট্র্যাডিশন এখনো চলছে। সেই সঙ্গে তিনি বলেছেন কবিতার কথা। তখন ( ১৯৮৯) সালে কবিতার জন্য, দেশ পত্রিকার তরফ থেকে দেওয়া হত, দেড়শ টাকা। কবিতা নির্বাচনের ভার ছিল

সুনীল গঙ্গোপাধ্যাযের উপর। কবিতার জন্য পারিশ্রমিক দেওয়া শুরু করেন সাগরময় নিজে, তার আগে ছিল না। প্রথম শুরু হয় দশ টাকা পারিশ্রমিক দিয়ে।

জানতে পারলাম, দেশ পত্রিকায় আগে পুস্তক সমালোচনা বিভাগে সমালোচকের নাম থাকত না। উনি সেটার স্বীকৃতি দেন। ছোট খাটো ব্যাপারও ওনার দৃষ্টি এড়ায় না। কেউ কি জানে? পুজোর সময় শারদীয়া সংখ্যা প্রকাশের সময়, রাশভারী মানুষটি দাঁড়িয়ে থাকতেন, এস্প্ল্যানেড , মাকুরামের দোকানে , যেখানে পত্রিকা গুলো রাখা থাকত, সেখানে একটা থামের আড়ালে দাঁড়িয়ে দূর থেকে পাঠকদের চাহিদা দেখে, খুশি হতেন সন্তান প্রসবের পরে পিতার মতন।

ওনার সম্পাদক জীবন , দেশ পত্রিকার জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সে তো সকলেই জানি । এক সময় দেশ আর সাগরময় ঘোষ--আলাদা করে ভাবতে পারতাম না। বর্ণময় এই জীবনে উনি স্বীকার করেছেন , সবচেয়ে সুখকর স্মৃতি হল, ১৯৪০ সালে ,দেশ পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যা--বিদ্যাসাগর সংখ্যায়--গুরুদেবের ছোটগল্প প্রকাশ করা। সেই সময় রবীন্দ্রনাথ তেমনভাবে লেখা দিতে চান না। যদিও দেশ পত্রিকার সঙ্গে ওনার সম্পর্ক --বহুদিনের নিবিড় সম্পর্ক। তবু রবীন্দ্রনাথ রাজি হচ্ছিলেন না। কিন্তু , সাগরমযের অনুরোধে একটি গল্প দিলেন, যেটি অন্য জায়গায় ছাপা হবার কথা ছিল। গল্পটি, তিনসঙ্গীর শেষ গল্প শেষকথা নাম। কিন্তু, দেশে বেরোনোর সময় ওর নাম ছিলনা। ছোটগল্প হিসেবে বেরিয়েছিল।

সাগরময় ঘোষ, আমার প্রিয় ব্যক্তিত্ব। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সম্পাদক যখন বলেন

বাংলা ছোটগল্প বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে সমান আসন পেতে পারে। তখন ভালোলাগা তৈরি হয়।

বঙ্গসাহিত্যের কর্ণধার রূপে সাগরময় ঘোষের অসামান্য ভূমিকা কোনোদিন বিস্মৃত হবার নয়। লেখক গড়ার কারিগর এই বিরাট মাপের মানুষটিকে নিয়ে লেখার আরো ইচ্ছে রইল।

jayati

      জয়তী রায়