হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত নামটার সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় আনন্দমেলা পত্রিকার মাধ্যমে| প্রথম লেখা যেটা আমি পড়েছিলাম সেটা হল মানুষ-কুমির| পূজাসংখ্যা আনন্দমেলা ২০০৭| তখন আমি পঁচিশ| আনন্দমেলা সহ ছোটদের পত্রিকার সাধারণ সংখ্যা কেনা অনেকদিন বন্ধ করে দিয়েছি| পূজা সংখ্যা কিনি অভ্যেসের বশে| অনেকদিন পরে একটা টান-টান অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী পড়েছিলাম| লেখকের নাম ছাড়া কিছুই জানা ছিলনা সেদিন| এরপর দুটো ছোটগল্প বিকেলের আলোয় আর রিং মাস্টার|

কাট টু ২০১১, উনিশ-কুড়ি পুজা সংখ্যা, উপন্যাস পরিবাড়ির পরি| আমার পড়া ওঁর লেখা প্রথম বড়দের লেখা| উনিশ-কুড়ি পত্রিকাতে বেরোলেও কাহিনী বেশ প্রাপ্তমনস্কদের জন্য| উনিশ-কুড়িতে বেরোনো আর পাঁচটা প্যানপ্যানে প্রেমের উপন্যাস তো নয়ই| পড়তে পড়তে মনে হয়েছিল, উপন্যাসটা যে শহরের পটভূমিকায় লেখা সেটা কাঁচরাপাড়া হলেও হতে পারে|

সেই বছরই শারদীয়া কিশোর ভারতীতে পেলাম চাঁদবরের শেষ শ্লোক| যে পত্রিকার উপন্যাস তালিকায় একটা ঐতিহাসিক উপন্যাস জ্বলজ্বল করত, যেখানে কালের জয়ডঙ্কা বাজে কিংবা অজ্ঞাত নায়কের মত ঐতিহাসিক উপন্যাস চাপা হত, শেষ কয়েক বছর উপন্যাসগুলো কেমন যেন ইতিহাসের নোট্ বই মার্কা হয়ে গেছিল| হিমাদ্রিকিশোর এসে সেই ঐতিহ্যকে পুনরুদ্ধার করলেন, চন্দ্র্ভাগার চাঁদ, ফিরিঙ্গি ঠগী, কত কক্ষে কাগজ পোড়ে, এলাপুর ভাস্কর হয়ে যা এখনও সগৌরবে চলছে| একটা ইন্টারভিউতে হিমাদ্রিকিশোর জানিয়েছিলেন যে ইতিহাস পড়তে অনেকেরই ভালো লাগে না, কিন্তু উনি ইতিহাস নির্ভর কাহিনী এমন ভাবে উপস্থাপিত করতে চান যা সবার পড়তে ভালো লাগবে|

আরো পরে ২০১৩তে বন্ধু সমুদ্র বসুর মাধ্যমে জানলাম লেখক ফেসবুকে আছেন| এবং সত্যিই তিনি কাঁচরাপাড়াতে থাকেন| সে বছরের মাঝামাঝি একদিন যখন কলকাতা তুমুল বৃষ্টিতে ভাসছে তখন পেলাম লেখকের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট| সঙ্গে মেসেজ| আমি তখন উত্তর দেব কি, কোথায় পালাবো ভাবছি| সেবারই পেলাম আনন্দমেলা পূজাসংখ্যায় উপন্যাস বরফ দেশের ছায়ামানুষ|

২০১৪ বইমেলায় শিশু সাহিত্য সংসদ থেকে প্রকাশিত হল যুদ্ধ যখন জঙ্গলে| তার আগে সুন্দাদ্বীপের সোনার ড্রাগন, সূর্যমন্দিরের শেষ প্রহরী থেকে কালো টিয়ার দ্বীপে হয়ে মানুষ কুমির সব খুঁজে খুঁজে কিনেছি আর পড়েছি| যুদ্ধ যখন জঙ্গলে বইটা নিয়ে আমার করা একটা মন্তব্যে লেখক দুঃখিত হন এবং ফেসবুকে আমাকে ব্লক করে দেন| আমি কিন্তু ওঁর লেখা বই পড়া বন্ধ করিনি| বরং তার পরেই অন্য বইগুলো পড়েছি| ২০১৪-র এপ্রিলে প্রথমবার হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত-র সঙ্গে সামনা সামনি দেখা হয় আমার| পয়লা বৈশাখের দিন| সেদিন ওঁর লেখা নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ কথা হয়| কিছু অসামান্য মুহূর্ত কাটিয়েছিলাম সেদিন| এর পরে যেদিন ওঁর সাক্ষাত পাই সেটা খুবই আশ্চর্যজনক একটা ঘটনার মধ্যে দিয়ে| উনি চাঁদনী চক এলাকার ডিউক-এ মাঝে মাঝে আসেন, সেটা জানতাম| সেদিন ছিল মে মাসের একটা রবিবার, আমাকে অফিসে আসতে হয়েছিল| দুপুর তিনটে নাগাদ চাঁদনী মেট্রোতে নামতে যাবো হঠাত্ আমার নাম ধরে একটা চিত্কার শুনলাম| গুরুত্ব না দিয়ে নিচে নামছি এর মধ্যে এক বন্ধুর ফোন, তুমি কি চাঁদনী মেট্রোতে নামছ? উত্তর হ্যাঁ শুনে বলল উল্টোদিকের এসক্যালেটর দিয়ে বেরিয়ে এসো জলদি| বেরিয়ে দেখি সেই বন্ধু আর লেখক দাঁড়িয়ে আছেন ডিউকের সামনে| তারপর আর কী, প্রচুর খাদ্য পানীয় সহযোগে আড্ডা এবং শেষে গাড়িতে করে আমাকে বাড়ির কাছাকাছি ছেড়ে দিয়েছিলেন| সঙ্গে উপরি পাওনা ফেসবুকের ব্লক উদঘাটন এবং বন্ধুত্ব ফিরে পাওয়া| তখন থেকেই লেখক হিমাদ্রি কিশোর আমার কাছে হিমাদ্রিদা|

এরপর বইমেলা, কলেজ স্ট্রিট, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বহু জায়গায় হিমাদ্রিদার সঙ্গে দেখা হয়েছে| লেখা নিয়ে মুগ্ধতার কথা বারে বারে জানিয়েছি তাঁকে| গতবছর উপেন্দ্র কিশোর স্মৃতি পুরস্কারে ভূষিত হলেন তিনি, ইচ্ছে থাকলেও সেদিন যেতে পারিনি, ছবিতে দেখেই সন্তুষ্ট থাকতে হয়েছে|

গতবছরই ডিসেম্বর মাসে হিমাদ্রিদা আমাকে জানান, অন্য আরো কয়েকজনের সঙ্গে আমাকে একটা বই উত্সর্গ করতে চান, আমার আপত্তি আছে কি না? আপত্তি কিসের আমি তো তখন আনন্দে নাচছি, সে রাত্তিরে ঘুমই হল না| সেই বই রাক্ষুসে নেকড়ে প্রকাশিত হল এবছর এপ্রিলে, পয়লা বৈশাখে| লেখকের হাত থেকে স্বাক্ষর করা বই পাওয়ার আনন্দই আলাদা|

সমুদ্রর গ্যালারী যেখানে লেখকের লেখার সংগ্রহ সেখানে হিমাদ্রিদার প্রথম লেখা “হালচি ফুলের ছোট্ট গ্রাম ‘চম্পি’” থেকে শুরু করে “রোলাং” পর্যন্ত সব লেখা রয়েছে| সব লেখা এখনও পড়া না হলেও, যতটুকু পড়া হয়েছে তার মধ্যে অ্যাডভেঞ্চার কাহিনীর মধ্যে সূর্যমন্দিরের শেষ প্রহরী আমার মতে সেরা| আর ঐতিহাসিক কাহিনীর মধ্যে কোনটা সেরা বাছা খুব মুশকিল, তবু যে লেখাটা পড়ে আমার আলাদা একটা ফিলিং হয়েছিল স্বাধীনতার শহীদদের জন্য সেই উপন্যাসের কথা বলব| খুব বেশি মানুষ হয়ত পড়েননি, ২০১৬ পূজাসংখ্যা রংবেরঙে প্রকাশিত উপন্যাস বিষাণ উঠেছে বাজিয়া| মেদিনীপুরের অত্যাচারী শাসক বার্জকে হত্যা করার ঘটনা নিয়ে লেখা| পড়তে পড়তে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে|

আজ ১৭ই মে হিমাদ্রিদার জন্মদিন| জন্মদিনের অনেক অনেক শুভেচ্ছা| ভালো থাকুন| আরো অনেক অনেক লিখুন|

পুনশ্চ: সঙ্গের ছবিতে বইমেলায় হিমাদ্রিদার ইন্টারভিউ নিচ্ছি আমি|