পৃথিবীতে একদা অজস্র ভাষা ছিল। আজ তার মধ্যে অনেক ভাষাই নেই। অনেকানেক ভাষাই বিলুপ্তপ্রায়। যে সব জনগোষ্ঠিরা নিজ ভাষায় কথা বলেন সে ভাষা তাঁরা না থাকলে বা তাঁরা অন্য ভাষাকে আয়ত্ব করে এ সব ভাষা ভুলে গেলে তাঁদের ভাষাও থাকবে না। শুধু ভারতবর্ষেই এই মুহুর্তে আটং থেকে জেমে পর্যন্ত বিপন্ন, অবশ্য বিপন্ন, অতি বিপন্ন, প্রায় বিপন্ন এমন ভাবে থাকা ভাষার সংখ্যা ১৯১টি।

যেগুলো আছে সেগুলো থাকার মধ্যে আগ্রাসনী রাজনীতি কাজ করে না? যেমন ধরুন ইংরেজী। আমাদের একদা প্রভুবাবা ছিল বলেই তো এখনো আমরা ইংরেজী না শিখলে চাকরি পাব কী না ভেবে আকুল থাকি। আন্দোলন করি ইংরেজী শেখার। প্রশ্ন করি না, এত এত দেশ ইংরেজী না শিখেও নিজেদের ভাষায় করে কম্মে খায় কী করে! রাষ্ট্র ব্যবস্থায় কী সেই বৈশিষ্ট্য যার মাধ্যমে তারা এ কাজ পারে। শিক্ষা হল চাকরির মাধ্যম মাত্র। এই যুক্তিতে একে মেনে নেওয়াটা আগ্রাসনের পক্ষে থাকা না?

অথবা হিন্দি ভাষা, সিরিয়াল এবং সিনেমার মাধ্যমে, সরকারি কোষাগারের টাকায় সারা দেশ জুড়ে প্রচারের মাধ্যমে আমাদের উত্তর-পশ্চিম, উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বাভাবিক ভাষা না হওয়া সত্ত্বেও যে ভাবে ছড়িয়েছে তাতে অন্য ভাষাগুলো এবং তা নির্ভর মাধ্যমগুলো অর্থনৈতিকভাবেও বিপন্ন (বাংলা সিনেমা বা আঞ্চলিক ভাষার সিনেমা এ সব অঞ্চলে যেমন), মেনে নেওয়াটা আগ্রাসনের পক্ষে থাকা না? আজ যদি এ সব অঞ্চলের সুস্থ, সবল সিনেমার বিকাশ হত তাহলে মুম্বাই-এর দাদাগিরি চলত নাকি? মারাঠি সিনেমা বুঝে নিয়েছে বলে দাদাগিরি করলে পাল্টা থাবড়ায়। আমরা কেঁউ কেঁউ করে মরি। প্রযোজনা থেকে বিপণন-প্রদর্শন সব অবাঙালি ব্যবসায়ীদের হাতে বলে তারা কথায় কথায় হুমকি দেয় আর আমরা মাথা নীচু করে মেনে নিই। আমরা মেনে নিই যে আমাদের মেগাসিরিয়ালে বাংলা সাহিত্যের এত সম্পদ থাকা সত্ত্বেও ওই কতগুলো চ্যানেলের সর্বভারতীয় স্তরে হিন্দিতে প্রচারিত জঘন্য নোংরাগুলোর মডেলেই মুম্বইতে গল্প তৈরী হবে, এখানে সংলাপ ভাজা হবে, আমরা জানব ঘরে সংসারে সমাজে শুধু নোংরামোই থাকে। এবং ভুলে যাব যে নুক্কড় বা মালগুডি ডেইজ-ও একদা আমরা দেখেছি।

থাক সে কথা এখন। এই যে এককালের ল্যাটিন বা সংস্কৃত মৃত - এত আগ্রাসী সাম্রাজ্য সকল তার পক্ষে থাকা সত্ত্বেও মৃত কেন? তার কারণ বিশ্লেষণ করে বলা হয় নির্দিষ্ট ক্ষমতাবানদের হাতেই তাকে বেঁধে রাখার কারণে দুটি অমন সুন্দর ভাষার মৃত্যু হয়েছে। আঞ্চলিক ভাষাগুলি বিকাশ লাভ করেছে আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীদের বিকাশের সঙ্গে এবং তারা এ ভাষাগুলিকে বাদ দিয়েই চলেছে বলে এ সব ভাষা আজ নিতান্ত জ্ঞানজাগতিক ভাষা হয়েই আছে। এবং অবশ্যই মনে রাখা দরকার একদা বিস্তৃত পারস্য সাম্রাজ্যের দরবারী ভাষার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র আজকের চেহারা হয়ে যাওয়াটাও। অর্থাৎ আগ্রাসনটিই ঘুরে ভাষার পক্ষে বাঁশ হতে পারে। আর ভুলে যেতে রাজী নই যে বাংলার বিকাশমান অবস্থার আদি যুগেই তার গলায় পা দিয়ে তার বদলে সংস্কৃতকেই রাজভাষা ও আঞ্চলিক ভাষা করার দাবী তোলার পন্ডিতদের কথা। বাংলা তাকে মুখের মত জবাবই দিয়েছিল।

নেপালি, কুর্মালি, সান্থালি, হো, মুন্ডারিদের উপর বাংলা চাপিয়ে দেওয়াটাও আগ্রাসন। অন্য ভাষাভাষীদের ভাষা বিকাশের সুযোগ থাকা অবশ্যই উচিত। প্রয়োজনে সরকারকে তার যোগ্য দোসর হতে হবে। আবার যে সব অঞ্চলে বাংলাই মাতৃভাষা সেখানে অন্যদের ভাষা আধিপত্যকে সদাপ্রভুর ভাষা বলে মেনে নেওয়াটাও আগ্রাসনের পক্ষে থাকা। এখানে ভারসাম্য রক্ষা করাটা কঠিন কাজ। কিন্তু কঠিন কাজ বলেই হাত গুটিয়ে বসে থাকতে হবে? ১৯৪৭ থেকে আজ ২০১৭- বাংলা ভাষায় বাঙালির রাজ্য বলে ভারতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থায় ঘোষিত অঙ্গরাজ্যে বাংলা ভাষাতেই নিম্ন-মধ্য এবং উচ্চশিক্ষা দেওয়া যাচ্ছে না, দিলে ছেলেমেয়েরা কাজ পাচ্ছে না মেনে নিয়ে আন্তর্জাতিকতার ধ্বজা ওড়াতে হবে?

পারলাম না। অন্যের ভাষাকে খর্ব করার ইচ্ছে আমার একবিন্দু নেই, তা বলে নিজের ভাষাকে খর্ব হতে দেবার ইচ্ছেও নেই। এবং আন্তর্জাতিকতা বলতে আমি এক ভাষা, এক বিশ্ব বুঝি না। আন্তর্জাতিকতা বলতে আঞ্চলিক সংস্কৃতিসমূহের বিকাশশীল ব্যবস্থায় আস্থা রাখাকেই বুঝি। আজ সরকারী স্তরে শিক্ষাব্যবস্থায় বাংলা এই পশ্চিমবাংলায় বাধ্যতামূলক করা হয়েছে, অন্য দুটি ভাষা বেছে নেবার ক্ষমতার সঙ্গে, এতে প্রাথমিক কাজটি হয়েছে বলেই মনে হয়। যদি দেখি যে এই ব্যবস্থা অন্য ভাষাকে হত্যা করতে উদ্যত, তখন তার বিরুদ্ধেই দাঁড়াব। যেমন গোর্খালি বা মানভূম-ধলভূমের বা কামতাপুরের ভাষার লড়াইকে সম্মান জানাই। সে আমলে সরকারের উল্টোদিকে দাঁড়িয়েই জানিয়েছি।

কিন্তু এখনো অবধি এ বাংলার বেশীরভাগ জায়গাতেই উল্টোটাই দেখছি তো। ইংরেজি-হিন্দি দ্বিভাষার যৌথ আক্রমণে কলকাতাতেই বাঙালি ও বাংলা বিপন্ন। এতে আনন্দ করে উদ্বাহু নৃত্য করতে পারব না। ভারত একটি যুক্তরাষ্ট্রিয় কাঠামো। অন্যান্য বহু রাজ্যে শুধু বাংলা জেনেই যদি আমি কাজ করার অধিকার না পাই তাহলে এখানেও বাংলা না জেনে কাজ করার অধিকার পাওয়া উচিত না। সার্বিক স্বাধীনতা যেমন একটা বিমূর্ত বোধ, তেমনই সার্বিক অধিকারও একটি বিমূর্ত ভাবনা। এগুলো পরস্পরের মধ্যে গুঁতোগুঁতিতেই সীমানা নির্ধারণ প্রক্রিয়া চালায়। রাষ্ট্রে বাস যখন করছি তখন রাষ্ট্রের মধ্যেকার ক্ষমতার লড়াই-এর সুতোগুলোকে অস্বীকার করে দিবাস্বপ্ন দেখতে আমি রাজী নই। বাংলার অধিকার বাংলাকে কেড়েই নিতে হবে, এটুকু ৪৭-এর পরের এতদিনগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রের থাপ্পড়ে থাপ্পড়ে বুঝে নিয়েছি।