অনমিত্র রায়

শুরুতেই একটু ‘অনধিকার চর্চা’ হয়ে গেল মনে হচ্ছে । এই শিরোনামটা দেওয়ার কোনো যোগ্যতাই আমি সম্ভবত এখনও অর্জন করিনি । কারণ, যাঁকে ঘিরে এই লেখা সেই ‘অ্যালফ্রেড হিচকক’-এর একটাও সিনেমা আমি এখনও দেখিনি । তাই এ লেখা আমার একটা ‘দুঃসাহস’ বলা যেতেই পারে । কিন্তু, আমি না লিখেও পারলাম না ।

আমার ‘সিনেমাপাগল’ বন্ধুদের সঙ্গে সাধারণ আড্ডায় মাতলে দু-চার কদম এগিয়েই সিনেমার প্রসঙ্গ এসে পড়ে, যার ব্যাপ্তি পুরোনো দিনের বাংলা, ইংরেজি সিনেমা থেকে একেবারে হাল আমল পর্যন্ত । এখানেই বিপত্তি । পুরোনো এবং হাল আমলের বাংলা সিনেমা তবু একরকম, ইংরেজি সিনেমার প্রসঙ্গ এলেই আমি কুঁকড়ে যাই । কিন্তু, আমি সিনেমাগুলোর নামের সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত ।

ছোটোবেলায় সিনেমা এবং নাটক দেখতে যাওয়ার সঙ্গী ছিল মা । চার্লি চ্যাপলিনের ‘সিটিলাইটস’ দেখতে দেখতে নুডলস খাওয়ার সময় মুখের মধ্যে বাঁশি ঢুকে যাওয়ার দৃশ্য দেখে যেমন হলের মধ্যেই হেসে গড়িয়ে পড়েছি, তেমনই ‘বর্ন ফ্রি’-তে এলসার গর্জন শুনে তীব্র ভয় পেয়ে মায়ের দিকে আর একটু ঘেঁষে ফিসফিস করে বলেছি, ‘মা, ভয় করছে । বাড়ি যাব ।’ ভেবেছি, ব্যালকনিতে এলসা আছে, এক্ষুনি আবার গর্জন করে লাফিয়ে পড়ল বলে । 

এর পর, জীবনে প্রথমবার অভিভাবক ছাড়া একা (ঠিক একা নয়, সঙ্গে আমার থেকে তিন বছর ছোটো মাসতুতো এক ভাই ছিল) কলকাতায় সিনেমা দেখতে যাওয়া । হল : নন্দন । সিনেমা : As Good As It Gets. নিকোলাস কেজ । সেদিন সিনেমা দেখার থেকে অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দটাই ছিল বেশি । কারণ, সেদিনের কর্মসূচি ছিল, প্রথমে চারটের শোয়ে সিনেমা, তারপর সাড়ে ছ-টায় অ্যাকাডেমিতে নাটক ‘কেনারাম বেচারাম’ দেখে বাড়ি ফেরা । এখনকার মতো রাতের দিকে ফেরার বাস পাব কি না, সেই চিন্তা তখন ছিল না ।

তারপর হঠাৎ একদিন হলে আবার একটা ইংরেজি সিনেমা দেখলাম । ‘Gone with the Wind’. কেন যে মা সেদিন ওই সিনেমাটা দেখাতে নিয়ে গেছিল আজও বুঝিনি । ‘As Good As It Gets’-এর মতোই সেদিন ‘Gone with the Wind’-এর মাথামুন্ডু কিছুই বুঝিনি । মা ছাড়া সেদিন আরও দুজন সঙ্গী ছিল । আমার দুই মামাতো বোন । তারা ছোটো থেকে পাহাড়ি ইশকুলে পড়েছে, তাই এইসব সিনেমা হৃদয়ঙ্গম করা তাদের কাছে জলভাত । আমআর সমস্যা হত (এবং এখনও মাঝেমধ্যেই হয়) ‘অ্যাকসেন্ট’ বা ‘উচ্চারণ’ নিয়ে । 

তাই যখন ‘জুরাসিক পার্ক’, ‘টুইস্টার’, ‘ইনডিপেন্ডেন্স ডে’ দেখেছি, কোনো অসুবিধেই হয়নি । ভাষা না বুঝলেও পর্দায় ঘটে চলা ঘটনা দেখেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছি । ‘Children of Heaven’ তো বুঝতে আরও অনেক সুবিধে হয়েছে । তার কারণ, ‘Children of Heaven’ ‘বোঝা’র আগে ‘অনুভব’ করেছি, আর তার ফলে শেষমেষ চোখ দিয়ে জল বেরিয়েছে ।

এই হল আমার ইংরেজি সিনেমা দেখার দৌড় ।

এবার আবার ‘হিচ’-এ ফিরি । 

ছোটোবেলা থেকে বাংলা ব্যাকরণের ‘ক্রিয়াপদ’ অধ্যায়ে পড়েছি, আমরা ভাত খাই । ফুটবল খেলি । বই পড়ি । টিভি দেখি । কিন্তু . . .

এখন আমি সিনেমা ‘পড়ছি’ । অনেকেই বলতে পারেন, ‘এ আর এমন কী কথা ! আমরা তো চিত্রনাট্য পড়ি।’ ব্যাপারটা তা নয় । ‘চিত্রনাট্য পড়া’ আর ‘সিনেমা পড়া’-র মধ্যে খুব সূক্ষ্ম একটা তফাত আছে । তা নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না, কারণ আপনারাও যখন সিনেমা ‘পড়বেন’, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার সঙ্গে একমত হবেন ।

ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি তবে । সিনেমা ‘পড়া’-র বোধটা এল প্রসেনজিৎ দাশগুপ্তর বই ‘সাসপেন্সের সম্রাট হিচকক’-এর প্রুফ দেখতে বসে । প্রুফ দেখা শেষ করে এই লেখায় হাত দেওয়া উচিত ছিল । কিন্তু, বিশ্বাস করুন, পারলাম না । কখনো দুপুরে ভাতের থালায় ভাত বেড়ে মা ডেকে ডেকে সারা, ‘ওরে, ঠান্ডা হয়ে গেল, খেতে আয় ।’ কখনো, রাত সাড়ে এগারোটায় ঘুমিয়ে ভোর সাড়ে তিনটেয় ঘুম ভেঙে যায় ‘হিচকক’-এর ডাকে । 

আমি পারছি না । হিচকক-কে ছেড়ে আমি এক মুহূর্তও থাকতে পারছি না । একটানা বসে কাজ করার জন্য স্পন্ডিলোসিসের যন্ত্রণায় কোমর অসাড় হয়ে যাচ্ছে, মা-বাবা কখনো রীতিমতো বকুনি দিচ্ছে, ‘এবার থাম, একটু রেস্ট নে । শরীর আগে, না, কাজ আগে?’ চেয়ারের পেছনেই বিছানা । চেয়ার থেকে বিছানায় যাওয়ার জন্য কোনো পরিশ্রমই করতে হবে না । তবু, বার বার একই উত্তর দিয়ে যাই, ‘এই হয়ে এসেছে, এই প্যারাটা দেখেই আপাতত উঠব ।’

সেই প্যারাটা যেন শেষই হতে চায় না । যেন অনন্তের ঘূর্ণিতে পড়ে যাই । একটা প্যারা অবলীলায় গড়িয়ে গিয়ে পরের প্যারার হাত ধরে বলে, ‘চলো, হে । আরও খানিকটা যাই ।’ 

এখনও পর্যন্ত না-দেখা ‘The Birds’ তৈরির গল্পটা পড়ে বুঝতে পারি, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে । নয় নয় করে অনেক বছর বয়স হয়ে গেল এই ‘প্রুফ রিডিং জীবন’-এর । প্রুফ দেখতে দেখতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, এই অভিজ্ঞতা এই প্রথম ।

এত কিছু হয়তো নাও হতে পারত । হল, লেখকের জন্যই । প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত-র ‘বলা’-র ধরনই সিনেমা ‘পড়তে’ শেখাল । গোমুখ থেকে বেরিয়ে এসে বয়ে চলেছি মোহনার দিকে । আমার চলার গতি রুখবে এমন সাধ্য কার ?

হিচঅনমিত্র রায়শুরুতেই একটু ‘অনধিকার চর্চা’ হয়ে গেল মনে হচ্ছে । এই শিরোনামটা দেওয়ার কোনো যোগ্যতাই আমি সম্ভবত এখনও অর্জন করিনি । কারণ, যাঁকে ঘিরে এই লেখা সেই ‘অ্যালফ্রেড হিচকক’-এর একটাও সিনেমা আমি এখনও দেখিনি । তাই এ লেখা আমার একটা ‘দুঃসাহস’ বলা যেতেই পারে । কিন্তু, আমি না লিখেও পারলাম না ।আমার ‘সিনেমাপাগল’ বন্ধুদের সঙ্গে সাধারণ আড্ডায় মাতলে দু-চার কদম এগিয়েই সিনেমার প্রসঙ্গ এসে পড়ে, যার ব্যাপ্তি পুরোনো দিনের বাংলা, ইংরেজি সিনেমা থেকে একেবারে হাল আমল পর্যন্ত । এখানেই বিপত্তি । পুরোনো এবং হাল আমলের বাংলা সিনেমা তবু একরকম, ইংরেজি সিনেমার প্রসঙ্গ এলেই আমি কুঁকড়ে যাই । কিন্তু, আমি সিনেমাগুলোর নামের সঙ্গে মোটামুটি পরিচিত ।ছোটোবেলায় সিনেমা এবং নাটক দেখতে যাওয়ার সঙ্গী ছিল মা । চার্লি চ্যাপলিনের ‘সিটিলাইটস’ দেখতে দেখতে নুডলস খাওয়ার সময় মুখের মধ্যে বাঁশি ঢুকে যাওয়ার দৃশ্য দেখে যেমন হলের মধ্যেই হেসে গড়িয়ে পড়েছি, তেমনই ‘বর্ন ফ্রি’-তে এলসার গর্জন শুনে তীব্র ভয় পেয়ে মায়ের দিকে আর একটু ঘেঁষে ফিসফিস করে বলেছি, ‘মা, ভয় করছে । বাড়ি যাব ।’ ভেবেছি, ব্যালকনিতে এলসা আছে, এক্ষুনি আবার গর্জন করে লাফিয়ে পড়ল বলে । এর পর, জীবনে প্রথমবার অভিভাবক ছাড়া একা (ঠিক একা নয়, সঙ্গে আমার থেকে তিন বছর ছোটো মাসতুতো এক ভাই ছিল) কলকাতায় সিনেমা দেখতে যাওয়া । হল : নন্দন । সিনেমা : As Good As It Gets. নিকোলাস কেজ । সেদিন সিনেমা দেখার থেকে অ্যাডভেঞ্চারের আনন্দটাই ছিল বেশি । কারণ, সেদিনের কর্মসূচি ছিল, প্রথমে চারটের শোয়ে সিনেমা, তারপর সাড়ে ছ-টায় অ্যাকাডেমিতে নাটক ‘কেনারাম বেচারাম’ দেখে বাড়ি ফেরা । এখনকার মতো রাতের দিকে ফেরার বাস পাব কি না, সেই চিন্তা তখন ছিল না ।তারপর হঠাৎ একদিন হলে আবার একটা ইংরেজি সিনেমা দেখলাম । ‘Gone with the Wind’. কেন যে মা সেদিন ওই সিনেমাটা দেখাতে নিয়ে গেছিল আজও বুঝিনি । ‘As Good As It Gets’-এর মতোই সেদিন ‘Gone with the Wind’-এর মাথামুন্ডু কিছুই বুঝিনি । মা ছাড়া সেদিন আরও দুজন সঙ্গী ছিল । আমার দুই মামাতো বোন । তারা ছোটো থেকে পাহাড়ি ইশকুলে পড়েছে, তাই এইসব সিনেমা হৃদয়ঙ্গম করা তাদের কাছে জলভাত । আমআর সমস্যা হত (এবং এখনও মাঝেমধ্যেই হয়) ‘অ্যাকসেন্ট’ বা ‘উচ্চারণ’ নিয়ে । তাই যখন ‘জুরাসিক পার্ক’, ‘টুইস্টার’, ‘ইনডিপেন্ডেন্স ডে’ দেখেছি, কোনো অসুবিধেই হয়নি । ভাষা না বুঝলেও পর্দায় ঘটে চলা ঘটনা দেখেই যা বোঝার বুঝে নিয়েছি । ‘Children of Heaven’ তো বুঝতে আরও অনেক সুবিধে হয়েছে । তার কারণ, ‘Children of Heaven’ ‘বোঝা’র আগে ‘অনুভব’ করেছি, আর তার ফলে শেষমেষ চোখ দিয়ে জল বেরিয়েছে ।এই হল আমার ইংরেজি সিনেমা দেখার দৌড় ।এবার আবার ‘হিচ’-এ ফিরি । ছোটোবেলা থেকে বাংলা ব্যাকরণের ‘ক্রিয়াপদ’ অধ্যায়ে পড়েছি, আমরা ভাত খাই । ফুটবল খেলি । বই পড়ি । টিভি দেখি । কিন্তু . . .এখন আমি সিনেমা ‘পড়ছি’ । অনেকেই বলতে পারেন, ‘এ আর এমন কী কথা ! আমরা তো চিত্রনাট্য পড়ি।’ ব্যাপারটা তা নয় । ‘চিত্রনাট্য পড়া’ আর ‘সিনেমা পড়া’-র মধ্যে খুব সূক্ষ্ম একটা তফাত আছে । তা নিয়ে আমি কিছু বলতে চাই না, কারণ আপনারাও যখন সিনেমা ‘পড়বেন’, আমার দৃঢ় বিশ্বাস আমার সঙ্গে একমত হবেন ।ব্যাপারটা একটু খুলেই বলি তবে । সিনেমা ‘পড়া’-র বোধটা এল প্রসেনজিৎ দাশগুপ্তর বই ‘সাসপেন্সের সম্রাট হিচকক’-এর প্রুফ দেখতে বসে । প্রুফ দেখা শেষ করে এই লেখায় হাত দেওয়া উচিত ছিল । কিন্তু, বিশ্বাস করুন, পারলাম না । কখনো দুপুরে ভাতের থালায় ভাত বেড়ে মা ডেকে ডেকে সারা, ‘ওরে, ঠান্ডা হয়ে গেল, খেতে আয় ।’ কখনো, রাত সাড়ে এগারোটায় ঘুমিয়ে ভোর সাড়ে তিনটেয় ঘুম ভেঙে যায় ‘হিচকক’-এর ডাকে । আমি পারছি না । হিচকক-কে ছেড়ে আমি এক মুহূর্তও থাকতে পারছি না । একটানা বসে কাজ করার জন্য স্পন্ডিলোসিসের যন্ত্রণায় কোমর অসাড় হয়ে যাচ্ছে, মা-বাবা কখনো রীতিমতো বকুনি দিচ্ছে, ‘এবার থাম, একটু রেস্ট নে । শরীর আগে, না, কাজ আগে?’ চেয়ারের পেছনেই বিছানা । চেয়ার থেকে বিছানায় যাওয়ার জন্য কোনো পরিশ্রমই করতে হবে না । তবু, বার বার একই উত্তর দিয়ে যাই, ‘এই হয়ে এসেছে, এই প্যারাটা দেখেই আপাতত উঠব ।’সেই প্যারাটা যেন শেষই হতে চায় না । যেন অনন্তের ঘূর্ণিতে পড়ে যাই । একটা প্যারা অবলীলায় গড়িয়ে গিয়ে পরের প্যারার হাত ধরে বলে, ‘চলো, হে । আরও খানিকটা যাই ।’ এখনও পর্যন্ত না-দেখা ‘The Birds’ তৈরির গল্পটা পড়ে বুঝতে পারি, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে । নয় নয় করে অনেক বছর বয়স হয়ে গেল এই ‘প্রুফ রিডিং জীবন’-এর । প্রুফ দেখতে দেখতে গায়ে কাঁটা দিচ্ছে, এই অভিজ্ঞতা এই প্রথম ।এত কিছু হয়তো নাও হতে পারত । হল, লেখকের জন্যই । প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত-র ‘বলা’-র ধরনই সিনেমা ‘পড়তে’ শেখাল । গোমুখ থেকে বেরিয়ে এসে বয়ে চলেছি মোহনার দিকে । আমার চলার গতি রুখবে এমন সাধ্য কার ?