নটী বিনোদিনী দাসী চলে গেলে ওয়াজিদ আলি শাহ বললেন, এ বড় শোকের উপাখ্যান মালকা। ২৩ বছরে একজন শিল্পী অবসর নিয়ে নিচ্ছেন, এ আমি মানতে পারি না। মালকা জান, আমি বিনোদিনীর মুখে ঠাকুর রামকৃষ্ণের নাম শুনলাম। তুমি জানো যে আমি ভীষণ কৃষ্ণভক্ত। কে এই প্রেমের ঠাকুর রামকৃষ্ণ! আমাকে তাঁর কথা বলো।

কিশোরী গওহর জানের মা বাদশা ওয়াজিদের সভাশিল্পী বড়ে মালকা জান বললেন, সে এক সহজ ঠাকুর গো রাজা। রামের তীরধনুক কিংবা শ্রীকৃষ্ণের চক্র তাঁর হাতে নেই, মুখে আছে প্রেমের বাণী। ঠাকুর চৈতন্যদেব আর রামকৃষ্ণ ভালবাসার অস্ত্রে সকলকে কাছে টেনেছেন। চৈতন্যের ভক্তিরস জগতকে দিয়েছে সঙ্গীত আর রামকৃষ্ণের বিভঙ্গ দুনিয়াকে দান করেছে ধ্রুপদী নৃত্য। পরাজিত করে নয়, বিপক্ষকে জয়ী করে, তাঁদের সাধনপদ্ধতিকে মেনে নিয়ে ঠাকুর হয়েছেন রামকৃষ্ণ। হিন্দু ধর্ম শুধু নয় গো বাদশা, ঠাকুর নাসারা আর ইসলাম ধর্মের সব পদ্ধতি সাধন করেছেন। সুফি ওয়াজিদ আলি, সে আপনি নন, তাঁর অন্য নাম গোবিন্দ রায়, এক সময়ে পুলিশে চাকরি করতেন, তিনি ঠাকুরকে ইসলামের মজহাবে দীক্ষা দেন। দক্ষিণেশ্বর কালী মন্দিরের যে বাগান তার পাশে আছে একটি বাগিচা, আর সেই বাগানের অন্দরে রয়েছে ছোট্ট একটি মসজিদ। সেখানে ঠাকুর দিনে পাঁচ ওয়াক্ত নমাজ পড়েছেন। মুসলমানের মতো সাজ করেছেন। খাবারদাবারও খেয়েছেন তাদের মতো।

ঠাকুরের সঙ্গে নবির সংযোগের কথা তিনি নিজেই বলেছেন। খোদাতে বিলীন হয়ে যাওয়া আর লওহে মাহফুজের তন্ত্রকথায় ঠাকুর আপ্লুত। বেদ আর তন্ত্রের সমাধির সঙ্গে সুফি মুসলমানের ফানাকে তিনি অভিন্ন ঘোষণা করেছেন। এই অস্ত্র তীরধনুক আর চক্রের চেয়ে যে কত বড় তা একমাত্র প্রজ্ঞার তরবারি জানে। কুরানের সুরা আবৃত্তি করতে করতে ঠাকুর ফানায় লীন হয়ে যান।

ওয়াজিদ আলি শাহ বললেন, সেই ঠাকুরের কাছে আমি যেতে চাই। ভাসাও নৌকা। মালকা জান, আপনিও চলুন আমার সঙ্গে। ঠাকুরের সঙ্গে আমি বাংলায় কথা বলতে পারব। আপনাদের কথা শুনে মনে হচ্ছে, কলকাতার এই ভঙ্গুর, এলিয়ে পড়া ধুতি সংস্কৃতিতে ঠাকুর যেন এক ঋজু শালপ্রাংশু, নারায়ণ শিলার মতো তাঁর ব্যক্তিত্ত্ব। তিনিই প্রকৃত শক্তিমান তাই তাঁর ক্ষমতার আস্ফালন নেই, আছে শক্তির স্নিগ্ধতা। প্রকৃত শক্তি শুধু প্রেম বিলোতে পারে। এই ঠাকুর আমার চাই। লাগাও নৌকা। বের করো আমার বোচা। আমি এক্ষুনি যাব বিচালি ঘাট, সেখান থেকে হাওড়া হয়ে দক্ষিণেশ্বর, কী এমন পথ!

শ্রীরামকৃষ্ণের এক গুণমুগ্ধ ভক্তের নাম আবদুল আজিজ। পেশায় চিকিৎসক। তাঁর আদি নিবাস পূর্ববঙ্গের সাতক্ষীরায়। তিনি মহেন্দ্রলাল সরকারের ছাত্র, সেই জন্য কলকাতায় থাকেন। তাঁকে সংবাদ পাঠানো হল। তিনি সশরীরে এলেন রাজাকে নিয়ে যেতে। নৌকায় উঠে তাঁকে ওয়াজিদ আলি শাহ জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি বুঝি প্রায়শই ঠাকুরের কাছে যান?...

দক্ষিণেশ্বরে নেমে আবদুল আজিজ ও রাজা ওয়াজিদ আলি শাহ দেখলেন চারদিক লাল-সবুজ-গেরুয়া রঙে ভরে গিয়েছে। এক অলৌকিক জ্যোতির মধ্যে দু জন মানুষ বসে আছেন। একজন ঠাকুর, অন্যজন মণিলাল মল্লিক। তাঁদের কথোপকথন শুনলেন রাজা ওয়াজিদ আলি। রক্তমাংসের মানুষ যেন নন তাঁরা। কোন বায়স্কোপে এই ছবি দেখা যাচ্ছে তা বুঝে উঠে পারলেন না ওয়াজিদ আলি শাহ। তিনি শুনতে পেলেন--ঠাকুর বলছেন, “সেদিন কলকাতায় গেলাম। গাড়িতে যেতে যেতে দেখলাম, জীব সব নিম্নদৃষ্টি -- সব্বাইয়ের পেটের চিন্তা। সব পেটের জন্য দৌড়ুচ্ছে!...

#আখতারনামা
লেখক: শামিম আহমেদ
প্রকাশক: #অভিযান পাবলিশার্স
মুদ্রিত মূল্য: ৫০০ INR