তিনি নিজের সম্পর্কে একবার বলেছিলেন, সচেতনভাবে বাস্তববাদের আদর্শগ্রহণ করে সেই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সাহিত্য করিনি বটে, কিন্তু ভাবপ্রবণতার বিরুদ্ধে প্রচন্ড বিক্ষোভ সাহিত্যে আমাকে বাস্তবতাকে অবলম্বন করতে বাধ্য করেছিল।

এই মত যাঁর, তিনি মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়

বাংলা সাহিত্যের এই অমর কথাশিল্পীর সকল রচনাতে ছড়িয়ে আছে অন্যায়ের বিরুদ্ধে আপষহীন সংগ্রাম, সমাজের নিম্নশ্রেণির মানুষের দারিদ্রক্লিষ্ট সহজ সরল জীবনের বাস্তব চিত্র।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অপর নাম প্রবোধ কুমার বন্দোপাধ্যায়। তাঁর বাল্যকালের ডাক নাম ছিল মানিক। এই ডাকনামেই ব্যবহার করেই সাহিত্যের ক্ষেত্রে বিখ্যাত হয়েছেন।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম সাঁওতাল পরগনার দুমকা শহরে ১৯০৮ সালের ২৯ মে। বাবা হরিহর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং মা নীরদাসুন্দরী। আদি নিবাস ছিল ঢাকার বিক্রমপুরে।

হরিহর ছিলেন সরকারি চাকুরে। কর্মসূত্রে নানা স্থানে বদলি হতে হয়েছে। ফলে বাংলা বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলে কেটেছে মানিকের বাল্যকাল। ফলে শৈশবেই নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ পেয়েছিলেন। তিনি কাছ থেকে দেখেছিলেন তাদের জীবনযাত্রা আর জীবনে বেঁচে থাকার সংগ্রামকে। আর এমনি করে এই সময় থেকেই জীবন সম্পর্কে একটি সচেতনতা গড়ে উঠেছিল তার মধ্যে। পরবর্তীকালে এই অভিজ্ঞতাই তাঁর সাহিত্যকর্মে বিধৃত হয়েছে।
মানিকের এক দিদি থাকতেন মেদিনীপুরে। কিছুদিন সেখানেও থাকতে হয়েছিল তাঁকে। মূলত তিনি দিদির বাড়িতে থেকেই মেদিনীপুর জেলা স্কুলে পড়াশোনা করতেন এবং সেখান থেকেই তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
এরপর ১৯২৮ সালে বাকুড়ার ওয়েসলিয়াম মিশন স্কুল থেকে আইএসসি পাস করেন। পরে তিনি অংকে অনার্স নিয়ে কোলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়ার সময়ই শুরু হয় তাঁর লেখালেখির জীবন।
বাংলা সাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের আবির্ভাব মুলত ছোট গল্পকার হিসেবে। ১৩৩৫ বঙ্গাব্দের পৌষ সংখ্যার বিচিত্রা পত্রিকায় তার অতসীমামী গল্পটি প্রথম প্রকাশিত হয়। এই গল্পের মধ্য দিয়েই সাহিত্য মহলে খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর প্রথম উপন্যাস দিবারাত্রির কাব্য প্রকাশিত হয় বঙ্গশ্রী পত্রিকায় ১৩৪৬ বঙ্গাব্দে। তখন মানিকের বয়স মাত্র ২১ বছর।
গল্প ও উপন্যাসে তাঁর নিজস্ব অভিনব দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায় তখন থেকেই।

ইতিমধ্যে তাঁর সাহিত্যখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে। তাই আর কলেজে বিএসসি পড়া হয়ে উঠল না। তিনি পড়াশোনা ছেড়ে পুরোপুরি লেখায় মন দিলেন। সাহিত্যকেই গ্রহণ করলেন জীবিকা হিসেবে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের জননী উপন্যাস প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ সালে। এটি প্রথম প্রকাশিত হয় তৎকালীন বিখ্যাত সাহিত্য সাময়িকী ভারতবর্ষ-তে ধারাবাহিকভাবে। এ ছাড়াও এই পত্রিকাতেই তাঁর দুখানি দু’খানি বিখ্যাত উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলো পুতুল নাচের ইতিকথা ও পদ্মানদীর মাঝি।

পূর্ববঙ্গের সাধারণ সমাজের কথা, তাদের জীবনের বিচিত্র আলেখ্য ও মরমী শিল্পীর মতো তিনি চিত্রিত করেছেন। এ ছিল তার এক নতুন জীবনদর্শন। ফলে অল্প সময়ের মধ্যেই বাংলা সাহিত্যজগতে তিনি সূচনা করেন নতুন যুগের।
খ্যাতি থাকলেও বিত্ত ছিল না। নানা কারণে প্রচণ্ড অর্থকষ্টের মধ্য দিয়ে চলতে হয়েছিল মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে। লেখালেখি করে যে সামান্য আয় হতো, তা দিয়ে সংসার চলত না ঠিক করে। তিনি বড় চাকরির প্রলোভনও ত্যাগ করেছিলেন। জীবনের শেষের দিকে পশ্চিমবঙ্গ সরকার তাঁকে একটি ভাতা প্রদান করার ব্যবস্থা করেন।

সংগ্রামী জীবনের সার্থক রূপকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন জীবনে প্রথম পর্বে ফ্রয়েডীয় তত্ত্বে বিশ্বাসী। পরবর্তীকালে তিনি মার্কসবাদে দীক্ষিত হন। তাঁর সাহিত্যে এই দুই প্রভাব সুস্পষ্ট। বস্তুত মার্কসবাদই তাঁকে মধ্যবিত্তসুলভ ভাবপ্রবণতার গণ্ডি থেকে উত্তরণের পথ নির্দেশ করেছিল। তিনি লাভ করেছিলেন প্রশস্ততর বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি।
ফ্রয়েডীয় মনস্তত্ত্বকে তিনিই সর্বপ্রথম যথার্থ জীবনবোধের সঙ্গে যুক্ত করে বাঙালি দরিদ্র মধ্যবিত্ত এবং ধনী সমাজের আশা আকাংখা, তাদের লোভ লালসা এবং নীচতা ও হীনতাকে নানা পরিপ্রেক্ষিতে রূপদান করেছেন। এই কারণে মানিকের উপন্যাস বাস্তবধর্মী হলেও গণ্ডিবদ্ধ নয়। ব্যক্তি ও সমাজের পারস্পরিক ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার ভেতর দিয়েই একটি অমোঘ রহস্যময় নিয়তির শিকার তাঁর গল্প উপন্যাসের পাত্রপাত্রীরা।

মাত্র আটচল্লিশ বছর বয়সে ১৯৫৬ সালের ৩ ডিসেম্বর কঠিন রোগভোগের পর সংগ্রামী জনতার শ্রম ও স্বেদের রূপকার মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়।

তার রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হল- অতসী মামী ও অন্যান্য গল্প (১৯৩৫), দিবারাত্রির কাব্য (১৯৩৫), পুতুর নাচের ইতিকথা (১৯৩৬), পদ্মানদীর মাঝি (১৯৩৬), প্রাগৈতিহাসিক (১৯৩৭), অমৃতস্য পুত্র (১৯৩৮), মিহি ও মোটা কাহিনী (১৯৩৮), সরীসৃপ (১৯৩৯), শহরতলী (১৯৪০), অহিংসা (১৯৪১), প্রতিবিম্ব (১৯৪৩), চিহ্ন (১৯৪৭), শহর বাসের ইতিকথা (১৯৪৬), চতুষ্কোণ (১৯৪৮), জীয়ন্ত (১৯৫০), সোনার চেয়ে দামী (১৯৫১), স্বাধীণতার স্বাদ (১৯৫১), ইতিকথার পরের কথা (১৯৫২), আরোগ্য (১৯৫৩), হরফ (১৯৫৫) এবং মাশুল (১৯৫৬)।