গোয়েন্দা হাজির - স্বর্নযুগের বিদেশী রহস্যভেদী

প্রকাশক----লালমাটি

দাম-----------২৫০ টাকা

পৃষ্ঠা ---------২২৮

বাঙালীর ভিতুর ডিম বলে বদনাম থাকলেও রহস্য-রোমাঞ্চ-গোয়েন্দা কাহিনির প্রতি টান বলো বা ভালবাসা তা কিন্তু ১০০% খাঁটি...সেই পাঁচকড়ি দের সময় থেকে শুরু করে যা আজও প্রবাহমান...তবে এ ভালবাসা শুধুমাত্র দেশীয় লেখক ও তাদের সৃষ্ট গোয়েন্দা চরিত্রদের প্রতি যদি বলি তবে বোধহয় কিঞ্চিৎ অনৈতিকই হবে...হ্যাঁ মানছি শার্লক হোমস আমাদের কাছে কোনদিন হোমসদা হননি বা মিস মার্পল কোনদিন মার্পলমাসি হননি বা ফাদার ব্রাউন কোনদিন ব্রাউনদাদু হননি তবুও এ চরিত্রগুলি বাঙালীর বড় কাছের...তবে আম বাঙালী বা সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালীর কাছে কনান ডয়েল...আগাথা ক্রিস্টি ও চেস্টারটন ছাড়া সেরকম ভাবে অন্য বিদেশী গোয়েন্দা কাহিনির লেখকেরা সেরকভাবে পরিচিত নন...মানছি ব্যাতিক্রমী পাঠক অবশ্যই আছেন তবে আমি সংখ্যাগরিষ্ঠ গোয়েন্দা কাহিনির পাঠকের কথাই বলছি...এই পরিপ্রেক্ষিতে লালমাটির এ প্রয়াসকে অবশ্যই সাধু সাধু বলে কুর্নিশ করা ছাড়া উপায় নেই...এই সংকলনে ১২ জন বিদেশী লেখকলেখিকার কলমে ১২টি গোয়েন্দা কাহিনি জায়গা পেয়েছে এবং প্রতিটি কাহিনি ভিন্ন রহস্যরসে পাঠককে রসসিক্ত করবে তা বলাই যায়...

১.মর্গ সরনীর হত্যাকান্ড

এডগার অ্যালান পো

*********************

অ্যালান পোকে আধুনিক গোয়েন্দা কাহিনির জনক ও এই গল্পটিকে প্রথম আধুনিক গোয়েন্দা কাহিনি বলা হয়...পো ১৮০৯ সালের ১৯শে জানুয়ারি জন্মগ্রহন করেন...এই গল্পটি ১৮৪১ সালে প্রকাশিত হয়...

মর্গ সরনীর একটি বাড়ীর চতুর্থ তলায় মা ও মেয়ের বীভৎসভাবে বিকৃত মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়...অত্যন্ত পাশবিক শক্তির দ্বারা বীভৎস নিষ্ঠুরতার সাথে মা ও মেয়েকে হত্যা করা হয়...মায়ের গলা কাটা ও মেয়েকে উল্টো করে চিমনির মধ্যে ঢোকানো অবস্থায় পাওয়া যায়...যে কামরায় মৃতদেহ পাওয়া যায় তার দরজা ও জানলা ভেতর থেকে বন্ধ করা ছিল...আপাতদৃষ্টিতে যা অবাস্তব তাই মঁশিয় অগুস্ত মি. ড্যুপাঁ তার অসামান্য পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা ও অসাধারন বিশ্লেষণী দক্ষতায় বাস্তবে প্রমান করেন...হত্যাকারী কে তা জানার পর হতবাক হয়ে যেতে হয় এবং গল্পটি পড়ার পর তার টানটান রোমাঞ্চ ও সাহিত্যগুন দেখে এটা বুঝে নিতে অসুবিধা হয়না কনান ডয়েলের মাপের সাহিত্যিক কেন অ্যালান পো কে গুরু মানতেন...

২.ছোট্ট ইস্পাতের কুন্ডলী

অ্যানা ক্যাথরিন গ্রীন

***********************

একটি গোয়েন্দা চরিত্রকে ধরে সিরিজ লেখার ধারা এই লেখিকাই প্রথম সুপ্রতিষ্ঠ করেন...জন্ম ১৮৪৬ সালের ১৯শে নভেম্বর...

মি. হোমস ব্যাবসায়িক কাজে শহরের বাইরে যান ও সেখান থেকে নিধারিত দিনে ফিরে আসবেন বলে মিসেস হোমসকে চিঠি লেখেন...নির্ধারিত দিনে মিসেস হোমস তার ঘরের কুশনে পিন দিয়ে আঁটকানো একটুকরো খবরের কাগজ দেখতে পান যাতে তার স্বামীর মৃত্যুসংবাদ লেখা ছিল...এরপর টেলিগ্রামেও তিনি একই সংবাদ পান...মৃতদেহের পাশে অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে কয়েকটি রিং ঝোলা একটি ছোট্ট তারের কুন্ডলী পাওয়া যায়....মৃতদেহের হাতের বুড়ো আঙুলে খুব ছোট একটি ছিদ্র...মিসেস হোমসের ভুলে যেতে চাওয়া অতীত...অমিত্রাক্ষর ছন্দে লেখা পান্ডুলিপি...রহস্যময় এক চরিত্র যাকে সবজায়গায় তাড়া করে বেরায় সেই তারের কুন্ডলি...রহস্য এই গল্পেও জমজমাট...

৩.কাফে রয়্যালের বাইরে আলোড়ন

ক্ল্যারেন্স রুক

*********************

এই লেখকের জন্ম ১৮৬২ সালে..কর্নেল ম্যাথুরিন অপরাধ জগৎের ও প্রতারনা চক্রের বড় মাথা...তাকে কিছুতেই ধরা যায় না...মিস ভ্যান স্নুপ তাকে কি অসামান্য চাতুর্যে কাফে রয়্যাল থেকে থানায় নিয়ে এসে গ্রেপ্তার করান তারই গল্প...

৪.রুপোলি আগুন

স্যর আর্থার কনান ডয়েল

***********************

কনান ডয়েলের জন্ম ১৮৫৯ সালের ২২শে মে...শার্লক হোমসের এই গল্পটি ১৮৯২ সালে প্রকাশিত হয়....ওয়েসেক্স ক্লাবের সম্ভাব্য বিজয়ী ঘোড়া 'রুপোলি আগুন'এর হঠাৎই অদ্ভুতভাবে অদৃশ্য হয়ে যাওয়া এবং ঘোড়াটির ট্রেনারের মর্মান্তিক হত্যারহস্য হোমস কি অসাধারন ভাবে উন্মোচন করেন তা নিয়েই এই গল্প...ট্রেনারের হত্যাকারী আসলে কে তা জানলে বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেতে হয়...

৫.রহস্যময় অতিথি

আর. অস্টিন ফ্রিম্যান

*******************

কনান ডয়েলের মতো এই লেখকেরও পেশা ছিল ডাক্তারি...জন্ম ১৮৬২ সালের ১১ই এপ্রিল...এই গল্পটি ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয়...ক্রফটন নামক এক ব্যাক্তি হঠাৎই উধাও হয়ে যান...লোকটি জার্ডিনের পেশেন্ট...জার্ডিনের অনুরোধে ডাঃ থর্নডাইক লোকটির ফাঁকা বাড়ীতে সূত্রের খোঁজে গিয়ে বাড়ীর বাইরে স্নানকুঠিতে লোকটিকে মৃত অবস্থায় পান এবং তদন্তে প্রমানিত হয় অর্থই মৃত্যুর কারন...

৬.পাতাল রেলে রহস্যময় মৃত্যু

ব্যারনেস এমুস্কা ওর্টসি

**************************

'কোনে বসা বৃদ্ধ' গোয়েন্দা যার হাতে সৃষ্টি সেই লেখিকা এমুস্কা ওর্টসির জন্ম ১৮৬৫ সালের ২৩ শে সেপ্টেম্বর...

পাতাল রেলের এক কামরায় এক মহিলার মৃতদেহ পাওয়া যায়... অ্যসিড প্রয়োগে হত্যা...'দেখা হবে' এই কথাটিই হত্যার মূল সূত্র...হত্যার অস্ত্র একটি আংটি...! হত্যাকারী এতটাই বুদ্ধিমত্তার সাথে হত্যা করে যে সে শাস্তি পায় না...কিভাবে তা সম্ভব জানতে হলে গল্পটি পড়তে হবে...

৭.ডুমডর্ফ রহস্য

মেলভিল ড্যাভিসন পোস্ট

**************************

আঙ্কল অ্যাবনারের স্রষ্টা এই লেখকের জন্ম ১৮৬৯ সালের ১৯শে এপ্রিল...এই গল্পটি ১৯১৪ সালে প্রকাশিত হয়...

ডুমডর্ফ নামক লোকটি অবশেষে খুন হন....দুজন বলে যে তাদের দ্বারাই হত্যা সংগঠিত হয়েছে...কিন্ত অ্যবনার প্রমান করেন কি অদ্ভুত ভাবেই না ডুমডর্ফের মৃত্যু হয়েছে...কিভাবে মৃত্যু হল...কি যাদুতে কি রহস্যে ডুমডর্ফ গুলিবিদ্ধ হলো তা নিয়েই গল্প...

৮.সারমেয়র দৈববানী

জি.কে.চেস্টারটন

*******************

ফাদার ব্রাউনের স্রষ্টা এই লেখকের জন্ম ১৮৭৪ সালের ২৯শে মে...

সামার হাউসে কর্নেল ড্রুসকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়...সামার হাউসটি বাগানের একেবারে শেষ প্রান্তে...ঢোকার বা বেরোবার অন্য কোনো পথ নেই...অনেক চরিত্র...অনেক রহস্য...ফাদার ব্রাউন ঘটনাস্থলে না গিয়ে শুধুমাত্র একজনের মুখ দিয়ে বর্ননা শুনে কিভাবে অত্যন্ত চতুর হত্যাকারীকে চিহ্নিত করলেন তা জানতে হলে গল্পটা পড়তেই হবে...

৯.খাঁটি টাবার্ড

এডম্যান্ড ক্লেরিহিউ বেন্টলি

************************

লেখকের জন্ম ১৮৭৫ সালের ১০ই জুলাই...এই গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৮ সালে...

টাবার্ড হলো কোটের মতো একটি পোষাক...এই গল্পে টাবার্ড একটি রাজকীয় চিহ্নযুক্ত পোষাক...এটি আদতে একটি প্রতারনার গল্প...গোয়েন্দা ফিলিপ ট্রেন্ট কিভাবে টাবার্ড নিয়ে প্রতারনাটা ধরে ফেলেন তা নিয়েই গল্প...

১০.উড়ন্ত শবদেহ

আর্চিবল্ড এডোয়ার্ড মার্টিন

***********************

লেখকের জন্ম ১৮৮৫ সালে...এই গল্পটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালে....

এক সবুজ ঘেরা মাঠে হঠাৎই এক মৃতদেহ আবিস্কার হয়...রাস্তা থেকে ৩০ ফুট নীচে মৃতদেহটা এলো কিভাবে...মৃতদেহের কানের পেছনে গুলির গর্ত...এবং মৃতদেহের পড়নে কোনো পোষাক নেই...ঘরোয়া গিন্নী মোনা এখানে গোয়েন্দার ভূমিকায়...এখানে প্রেমের বিচিত্র ধরনই খুনের কারন...তবে কিভাবে কি কায়দায় মৃতদেহ ওই জনমানবশূন্য মাঠে উড়িয়ে আনা হয়েছিল তা জানতে গল্পের শেষ পৃষ্ঠা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে...

১১.তদন্তে প্রকাশ

ফাদার রনাল্ড নক্স

*******************************

লেখকের জন্ম ১৮৮৮ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী... এই গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৯৩১ সালে...

এটি একটি বিচিত্র খুনের গল্প...জার্ভিসন নামক এক ব্যাক্তিকে খাটে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়...তিনি নাকি বিচিত্র কিছু পরীক্ষার জন্য ভেতর থেকে তালা মারা বদ্ধ ঘরে বেশ কিছুদিন একা ছিলেন এবং সেখানেই অনাহারে মারা যান...মাইলস ব্রেডন প্রমান করে দেন কি সাংঘাতিক চতুরতায় তাকে খুন করা হয়েছিল....

১২.তামার আঙুলওয়ালা লোকটার ঘৃন্য ইতিহাস

ডরোথি লী সেয়ার্স

******************************************

গোয়েন্দা পিটার উইমসির স্রষ্টা লেখিকার জন্ম ১৮৯৩ সালের ১৩ই জুন...এই গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৯২৮ সালে...

এক পাগল শিল্পী প্রেমের সন্দেহে খুন করে তাতে ধাতু প্লেটিং করে ঘরে আসবাব বানিয়ে রেখে দেন...কিভাবে পিটার উইমসি অভিনেতা ভর্ডেনকে সেই পাগল শিল্পীর হাত থেকে বাঁচান ও সেই শিল্পীর কি মর্মান্তিক পরিনতি হয় তা নিয়েই এই গল্প....

এই সংকলনের প্রতিটি গল্পই মূল গল্পের অনুবাদ...ভাষান্তর বা রুপান্তর নয় ফলে মূল গল্পের লেখকের লেখনশৈলী সম্পর্কে একট স্বচ্ছ ধারনা গড়ে ওঠে...চারজন অনুবাদক তাদের কাজটি অত্যন্ত যত্ন সহকারে করেছেন যার ফলস্বরুপ এরকম অনবদ্য একটি বই আমরা উপহার পেয়েছি....

 

Collected from the book review of Goutam Aich.