সে বেশ কিছু বছর আগের কথা। কাগজের একটা অ্যাসাইনমেন্ট করতে গিয়ে আচমকা এমন একটা তথ্য হাতে এসে গেল যে, তার পিছনে ছুটতে গিয়ে মূল অ্যাসাইনমেন্ট থেকে সরে আসতে বাধ্য হলাম। সে হোক, তবু এমন ঘটনা ছাড়া যায় না। আর সব শুনে এডিটরও অনুমতি দিয়ে দিলেন। ব্যস, আর ছাড়াছাড়ি নেই। সোজা লেগে পড়লাম।

কী বৃত্তান্ত, কী কাজ, সে সব নিয়ে বিশদে লিখছি না। আপাতত শুধু এটুকু বলছি, বাংলার এক বিখ্যাত রুপোলি পর্দার নায়ককে নিয়ে ঘটনা বা দুর্ঘটনা, যাই বলুন না কেন। সস্ত্রীক সেই নায়কের বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে নায়কের মা-বোন সহ বাকি পরিবার।

এই ঘটনার পুরোটা তত্ত্বতলাশ করতে গিয়ে এক অদ্ভুত অভিযোগের কথা শোনা গেল। নায়কের স্ত্রী নাকি তাঁর ঘোষিত শত্রুদের নিকেশ করতে তান্ত্রিক ক্রিয়াকর্মের সাহায্য নিয়ে থাকেন। তিনি নিজে এই ক্রিয়া করেন না, তাঁর পরিচিত তান্ত্রিককে দিয়ে নগদ অর্থের বিনিময়ে এই সব কাজ করান। তাঁকে লিস্ট দেওয়া হয়, কার কার ক্ষতি করতে হবে। সেই লিস্টে নাকি বাংলার এক স্বনামধন্য নায়িকার নামও ছিল।

যাই হোক, সে অন্য প্রসঙ্গ। তবে কথা হল, এই ধরনের তান্ত্রিক ক্রিয়া, বা খুব সহজ ভাষায় বোঝাতে গেলে ব্ল্যাক ম্যাজিক দিয়ে ভুল পথে আক্রোশ মেটানোর পন্থা ব্যবহার করে থাকে অজস্র মানুষ।

এই অভিযোগ শুধু কলকাতা নয়, ঝকঝকে বলিউডেও। মহেশ ভাট থেকে শুরু করে বেশ কয়েকজন নামীদামি পরিচালক সোজাসুজি বলেছেন, উঠতি কিংবা স্ট্রাগলিং শিল্পীদের শোয়ার ঘরে ব্ল্যাক ম্যাজিকে ব্যবহৃত অজস্র উপকরণ দেখা গেছে, দেখা যায়।

আর খবরের কাগজ খুললেই তো মারণ-বশীকরণের বিজ্ঞাপনে ছয়লাপ। সঙ্গে আবার লেখা, ‘বিফলে মূল্য ফেরত’।

অর্থাৎ তান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জবরদস্ত ব্যবহার দুনিয়া জুড়ে রমরম করে চলছে। বলা বাহুল্য, সেগুলোর সবকটাই অন্যায়ভাবে কার্যসিদ্ধির জন্য।

তন্ত্র মানেই সুতরাং আমরা যে অন্ধকার বুঝি, তার সঙ্গে দূর গ্রহেও আলোর কোনো সম্পর্ক থাকার কথা নয়।

কিন্তু কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ নিজে কি এমনটাই চাইতেন? না। কখনো না। নদীয়ার এই পণ্ডিত তথা মহাসাধকের হাত ধরে বিশ্বে প্রথম কালীমূর্তির প্রচলন হয়েছিল এ কথা সত্য। তার আগে কালীর কোনো মূর্তি বা রূপকল্পনা ছিল না। কালীপুজো হত ঘটে বা যন্ত্রে বা শিলায়।

এও সত্য, তাঁর মতো করে তন্ত্রও এত ভালো কেউ জানতেন না। নতুন করে তন্ত্র রচনা এবং ব্যাখ্যা আর তাকে রক্ষা সবকিছুই নিজের হাতে করেছেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ।

তবে এও সত্য, তন্ত্রের এমন ক্রূর ব্যবহারের দায় তাঁর নয়। তাঁর চর্চিত পথে তন্ত্র বরং অধ্যাত্মসাধনার আলো এনেছে দিগবলয়ে। হিন্দু দর্শন আর উপলব্ধির যেসব তত্ত্ব, তার বেশিরভাগই জন্ম নিয়েছে তন্ত্র থেকে। কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশের মুখ দিয়ে এ কথাই বলিয়েছেন এমন কেউ, যিনি বহু আলোকবর্ষ ভাবনার পথ পেরিয়ে পরিকল্পনা করেছেন যে, কোনও থ্রিলারের কেন্দ্রীয় চরিত্র হতে পারেন কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ!

অবশ্যই তন্ত্র নিয়ে থ্রিলার। ব্ল্যাক ম্যাজিক নিয়ে থ্রিলার। অন্ধকার নিয়ে থ্রিলার। তন্ত্রশক্তির অন্ধকার দিক যে কী ভয়ানক হতে পারে, তার নিখুঁত নিষ্ঠুর বর্ণনা নিয়ে থ্রিলার। প্রতিটা শব্দ যেন ভয়ঙ্কর মৃত্যুর দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে অবলীলায়। তবু...তবু এমন নির্মমতার মধ্যেও যেটুকু আলো, তা ঐ কৃষ্ণানন্দ আগমবাগীশ।

আলো আরো অনেক কিছুতেই ছড়ানো। তন্ত্রচর্চার সঙ্গে সঙ্গে সুতো ধরে ধরে গেঁথে নেওয়া হয়েছে পুরনো ইতিহাসের অনেক বিচিত্র অধ্যায়। পুরনো ভারতের ঠগী, তিব্বতের গোপন গুহায় নির্দিষ্ট কিছু বৌদ্ধিক মতবাদের নিকৃষ্ট চর্চা, বাংলার রাজারাজড়াদের ধর্মীয় পৃষ্ঠপোষকতা এবং সর্বোপরি অদ্ভুত ভাষা। যখন যে পর্যায় নিয়ে কথা বলা হয়েছে, তখন ঠিক সেই পর্যায়ের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে অদ্ভুত নৈপুণ্যে।

গোয়েন্দা কিংবা ভূত কিংবা ভয় সমস্ত কিছু তুড়িতে উড়িয়ে পাতায় পাতায় চাপ চাপ অন্ধকার। সম্ভবত এর আগে তন্ত্রকে নায়ক করে এমন অসম্ভবাব্য সম্ভাবনার জাল বোনা হয়নি।

জাল বোনা হয়েছে যতখানি দক্ষতায়, গোটানও হয়েছে ঠিক ততখানি দক্ষতায়।

গবেষণা এবং সাহিত্য ঠিক কোন স্তরে থাকলে এ কাজ সম্ভব, তা আশা করি পাঠকমাত্রই বুঝবেন।

ওহ, আসল কথাই তো বলা হয়নি।

বইয়ের নাম এবং ইনকুইজিশন, লেখক অভীক সরকার।

সমসাময়িক বাংলা সাহিত্যের বাতিস্তম্ভ বললেও বেশি বলা হয় না।

ebong

এবং ইনকুইজিশন

অভীক সরকার

Rs.250

The Cafe Table