Bhoy Nicher Ajana Bhasa O Aro Baro (Abhijnan Roychoudhury)

Publisher: Dev Sahitya Kutir

MRP : Rs.200

শিশু-কিশোর সাহিত্যের পাঠকদের সঙ্গে অভিজ্ঞান রায়চৌধুরীর পরিচয় করিয়ে দেওয়া বাহুল্য মাত্র। দুর্ভাগ্যের বিষয়, মায়োপিক সমালোচকেরা এই অসাধারণ লেখককে শুধুমাত্র কল্পবিজ্ঞান বা জঁর-ভিত্তিক ফিকশনের রচয়িতা হিসেবেই বর্গীকৃত করতে চান। অথচ, গত কয়েক বছরে এপার বাংলার প্রায় সবক'টি প্রথম সারির পত্রিকায় অভিজ্ঞান-এর যেসব যেসব লেখা প্রকাশিত হয়েছে, তাদের পড়ার পর পাঠক কিন্তু ঠিক সেই অনুভূতিরই নাগাল পেয়েছেন, যা পাওয়া যায় জঁর-এর বেড়া ভাঙা সার্থক ছোটোগল্প থেকেই। আলোচ্য সংকলনটি সেই সার্থকতার এক অনবদ্য নিদর্শন।

কী কী লেখা এই সংকলনে আছে, তা লেখার আগে বরং বলি আমার অতৃপ্তির কথা।
এমন একটি চমৎকার সংকলনে দুটি জিনিস প্রত্যাশিত ছিল, যাদের আমি পাইনি:

প্রথমত, লেখকের তরফে একটি পূর্বপাঠ, যা এই ধাবমান কালের জালে জড়িয়ে পড়া লেখক-প্রকাশক-পাঠক ত্রয়ীর অবস্থান, এবং সেই নিয়ে লেখকের নিজস্ব ভাবনাকে প্রকট করবে;

দ্বিতীয়ত, কোন লেখা আগে কোথায় প্রকাশিত হয়েছিল তার পরিচয়।
এবার আসি গল্পের কথায়।

(১) ভয়নিচের অজানা ভাষা: শারদীয়া "শুকতারা" ১৪২৫-এ প্রকাশিত এই বড়োগল্পটি বাংলা সাহিত্যের সম্পদ। এই আইসিস-জামাতি-চাড্ডি-ময়ূর অধ্যুষিত সময়ে দাঁড়িয়েও এত সহজ ভাষায় এমন করে আশা ও জীবনের গান গাওয়া যায়, একথা এই লেখাটি না পড়লে বিশ্বাস হতে চায় না।

(২) আলো-ছায়া: পূজাবার্ষিকী "আনন্দমেলা" ১৪২৫-এ প্রকাশিত এই গল্পটা নিজেই কিয়ারসক্যুরো ঘরানার খাঁটি নমুনা, কারণ সেটা ভূতের, না ভয়ের, না ইতিহাসের, না শিল্পের, এই ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতেই গল্প শেষ হয়ে গেল।

(৩) বাটারফ্লাই এফেক্ট: গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি, এই গল্পটা আগে পড়া না থাকলে, বিশেষত লেখককে শুধুই কল্পবিজ্ঞান সাহিত্যের স্রষ্টা হিসেবে জানলে, পাঠক এখানে "দ্য সাউন্ড অফ থান্ডার"-এর মতো কোনো কাহিনি আশা করবে। এটা ঠিক যে এই গল্পটা আপাতদৃষ্টিতে কল্পবিজ্ঞানের। কিন্তু এটাও ঠিক, যে প্লট-ভিত্তিক কাহিনির বদলে এখানে আমরা পেয়েছি আত্মানুসন্ধানের এক গভীর আখ্যান, যেমনটা এর আগে পেয়েছিলাম "নিয়ম যখন ভাঙে"-তে।

(৪) অ্যাকিনেটপসিয়া: "মায়াকানন" বার্ষিকী ১৪২৫-এ প্রকাশিত এই গল্পটার কেন্দ্রে আছে অনিলিখা, তবে এবারে সে কোনো বিজ্ঞানসুবাসিত অ্যাডভেঞ্চার করেনি, বরং করেছে রহস্যভেদ। দুঃখ একটাই, গল্পটা বড়ো তাড়াতাড়ি ফুরিয়ে গেল।

(৫) পরজীবী: বাংলা কল্পবিজ্ঞান সাহিত্য সচরাচর যে থিমগুলো এড়িয়ে চলে, তেমনই একটা থিম নিয়ে লেখা হয়েছে এই গল্পটি, যা গত বছর "শুকতারা" কল্পবিজ্ঞান সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছিল। গল্পটা দারুণ, তবে ঠিক জুতসই হয়ে শেষ হল না। ডক্টর পাই-এর এই গল্পটা আরো বড়ো, প্রপার সাইফি-হরর করে কি লেখা যায় না? লেখক কি একটু ভেবে দেখবেন প্লিজ, কারণ এই থিম নিয়ে বাংলায় শেষ বড়ো লেখা ছিল স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়-এর কলমে স্যার সত্যপ্রকাশের অ্যাডভেঞ্চার "ভ্যাম্পায়ার আইল্যান্ড"।

(৬) চড়াই-এর গল্প: এই গল্পটা পড়তে গিয়েও যেটা পাঠককে ছুঁয়ে যাবে, তা হল এর দৃষ্টিভঙ্গিগত সরলতা, এবং অনাবিল আশাবাদ। এক সময় প্রচেত গুপ্ত এইরকম লেখাই লিখতেন, যা পড়ার পর মনে হত, যেন মালিন্য আর হতাশায় গলা-অবধি পুঁতে থাকা আমার শরীর আবার কিছুটা মুক্তি পেল। প্রচেত প্রতিষ্ঠানের দশচক্রে ভূতায়িত হয়েছেন বলেই হয়তো অভিজ্ঞান তুলে নিয়েছেন তাঁর ব্যাটন।

(৭) মারগ্যাম কাসলে খানিকক্ষণ: লেখকের নিজস্ব রসবোধ, কল্পনা, বাস্তব, আর সমকাল মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেছে এই চমৎকার গল্পটায়। হুড়মুড়িয়ে নয়, আয়েশ করে পড়ুন গল্পটা।

(৮) পাথরের রাস্তায়: "বইমেলা" পত্রিকায় প্রকাশিত এই গল্পটা হল সেই বিন্দু, যার মধ্যে গত কয়েক বছরে সারা পৃথিবীকে ক্ষতবিক্ষত করে দেওয়া এক অমানবিক যুদ্ধের ফলে বয়ে যাওয়া রক্তের সিন্ধু ধরা পড়েছে। যাঁরা অভিজ্ঞান-এর লেখাকে শুধুমাত্র শিশু-কিশোর পাঠ্য ভেবে এড়িয়ে যান, এই গল্পটাও তাঁদের পড়ার বাইরে থেকে যাবে, তাই তাঁরা জানতেও পারবেন না, কতটা উষ্ণতা, কতটা স্পন্দন নিজের বুকে বয়ে বেড়াচ্ছে এই ছোট্ট গল্পটা।

(৯) আগে কোথায় দেখেছি: এই গল্পটা নিয়ে শুধু এটুকুই লেখার আছে যে, 'ভয়নিচের অজানা ভাষা', আর 'পাথরের রাস্তায়' ছাড়া যদি মাত্র একটা গল্প পড়েই এই বইটা সরিয়ে রাখতে চান তাহলে এই একটি গল্প পড়ুন। কেন? দয়া করে পড়ুন, তাহলেই বুঝতে পারবেন।

(১০) উলূপী: শারদীয়া "ম্যাজিক ল্যাম্প" ১৪২৫-এ প্রকাশিত এই গল্পটা পড়ে আমার মাথায় দুটো প্রশ্ন জাগল, আর সেগুলো হল:
ক] বিশ্বাস-অবিশ্বাস-সংস্কার এই ভাবনার টানাপোড়েন নিয়ে বিস্তর তথাকথিত সিরিয়াস লেখা পড়েছি, কিন্তু লোককথা, পুরাণ, আর অঙ্ক মিশিয়ে এমন ভয়ের গল্প, সেও আবার অনিলিখাকে কেন্দ্রে রেখে, এর আগে বিশেষ পড়িনি। লেখক যদি এই ধারায় আমাদের আরো কিছু "ওরে মা রে!" উদ্রেককারী লেখা উপহার দেন, তাহলে ফিদা হই।
খ] অনিলিখার সাজগোজ (নীল সালোয়ার কামিজ, চুলে ঝিনুকের ক্লিপ, এবং ঠোঁটে লাল লিপস্টিক) দেখে চিন্তিত হচ্ছি। এই মুহূর্তে বাংলা সাহিত্যের একমাত্র ডাকাবুকো নায়িকাটি কি শীঘ্রই পাত্রস্থ হবে? সেটা হলে কিন্তু আমরা অবস্থান ধর্মঘট করব!

(১১) বিশ্বাস: এই সংকলনের সার্বিক সুর যদি হয় "ভালো থেকো, ভালো রেখো", তাহলে এই গল্পটিও বেসুরো না হয়ে মরুতে সবুজের সাধনা করেছে।

(১২) একটু অন্যরকম: এক-আধটা গল্প হয়, যেগুলোর বিশ্লেষণ হয় না, হয় শুধু পড়া শেষ হলে গলার কাছে জমে ওঠা গিঁটটা একটা ঢোক গিলে সরানোর চেষ্টা। এটাও তেমনই।

(১৩) ছেলেটা এখনও বন্ধু খোঁজে: বাংলায় ভয়ের উপন্যাস লেখা খুব কঠিন কাজ। মানবেন্দ্র পাল, এবং কিছুটা (যেহেতু হরর বিষয়ে তাঁর টার্গেট পাঠক ছিলেন বড়োরাই) অনীশ দেব, এছাড়া শিশু-কিশোর সাহিত্যে এই নিয়ে সফল লেখকের সংখ্যা বড়োই কম। সৌভাগ্যক্রমে, ১৪২৫-এ দুটো পুজোসংখ্যায় আমরা ভয়ের উপন্যাস পেয়েছিলাম: শারদীয়া "কিশোর ভারতী"-তে সৈকত মুখোপাধ্যায়-এর 'ওরা থাকে পাতালে', এবং "আমপাতা জামপাতা"-য় আলোচ্য উপন্যাসটি। ইতিহাস, গথিক হরর, এবং শ্বাসরোধী আতঙ্কের পরিবেশ তিলে তিলে গড়ে তোলায় লেখক এখানে যে ধরনের মুনশিয়ানার পরিচয় দিয়েছেন, তা সত্যিই দুর্বল হৃদয়ের পাঠকের জন্য বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ জাগানিয়া।

সব মিলিয়ে তাহলে ব্যাপারটা কী দাঁড়াল? দাঁড়াল এই যে মাত্র দু'শো টাকা দিয়ে এগারোটা মন-ভালো-করা, গা-ছমছমানো, বা স্তব্ধবাক করে দেওয়া গল্প, প্লাস গত বছরের অন্যতম সেরা দুটি উপন্যাস পড়ার এই সুবর্ণসুযোগ হাতছাড়া করলে খুব-খুব ঠকে যাবেন।
দেব সাহিত্য কুটির এই চমৎকার বইটি আমাদের কাছে তুলে দিয়ে ধন্যবাদার্হ হলেন। আশা রাখি, আগামী দিনে এই সময়ের সেরা লেখকদের লেখা এমনি করেই তাঁদের মাধ্যমে সুমুদ্রিত হার্ডকভার হয়ে আমাদের কাছে আসবে।
পাঠ শুভ হোক।

Riju Ganguly

GUWAHATI, ASSAM

Source : Goodread Reviews