তাঁর জীবনে কোনও রহস্য নেই। মজা করে এ কথাটা বলেছেন অনেকবার, ঘরোয়া আড্ডায়। আর সেই তিনিই কিনা রহস্যের এমন সূক্ষ্ম জাল বুনতে কী নিপুণ যে ছিলেন, সে কথা বলাই বাহুল্য।

সুচিত্রা ভট্টাচার্য। হাতের করে গোনা যাবে না, এমন কিছু অল্প নারী-গোয়েন্দার সৃষ্টি যাঁদের হাতে হয়েছিল, তিনি তাঁদের মধ্যে অন্যতম সেরা, সন্দেহ নেই। তাঁর মিতিন মাসি আর টুপুরের উপাখ্যান পড়ে আন্দোলিত হয়নি, এমন কিশোরবেলা কারও নেই বোধহয়।

কিন্তু মিতিন মাসি কে? লেখিকা নিজেকে বসিয়েছেন কি?

না, না...উত্তরে তাঁর সোজা কথা, তিনি মোটেও অত দড় নন কোনও ব্যাপারেই। শুধু লেখা ছাড়া আর কিচ্ছুটি করতে পারেন না।

জন্ম তাঁর কলকাতায় নয়। বিহারের ভাগলপুরে জন্ম, ১৯৫০ সালে। একেবারে ছোট্টবেলা থেকেই লেখালেখির প্রতি প্রবল ঝোঁক। জনমএর পর অবশ্য কলকাতায় স্থানান্তরিত হয় তাঁর পরিবার। সুচিত্রা স্নাতক হন যোগমায়াদেবী কলেজ থেকে। গ্র্যাজুয়েশনের আগে অবধি তাঁর লেখালেখি চলত বেশ। তবে পাশ করার পর বিয়ে আর সংসার...এই সব মিলিয়ে লেখা থেকে সাময়িক বিরতি।

ঘরসংসার সামলে সুচিত্রা আবার লেখায় ফিরলেন সত্তরের দশকের শেষে। এবার একটু সিরিয়াস ভাবেই। প্রথমে শুরু করলেন তাঁর ছোটগল্প। আশির দশকের মাঝখান থেকে উপন্যাস শুরু।

প্রথম প্রকাশিত হল কাচের দেওয়াল উপন্যাস। তারপর আর তাঁকে পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। আধুনিক বাংলা সাহিত্যের সেরা লেখকদের সারিতে জায়গা পেয়ে গেলেন অচিরেই। লেখার জন্য তাঁর পাবলিক সার্ভিসের চাকরিটাও ছেড়ে দিতে দ্বিধা করলেন না সুচিত্রা।

মূলত নারীকেন্দ্রিক লেখা হলেও সুচিত্রার লেখায় শহুরে মধ্যবিত্ত সমাজের সম্পর্ক, মূল্যবোধ, অবমূল্যায়ন, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল, প্রেম এবং প্রেমহীনতা ইত্যাদি দিকের সার্থক সমাহার ঘটেছে। তাঁর লেখায় আশাপূর্ণা দেবী এবং মহাশ্বেতা দেবীর প্রভাব পড়েছে।

জীবনে অসংখ্য ছোটগল্প ছাড়াও ২৪ টি উপন্যাস লিখেছেন সুচিত্রা, যার প্রায় প্রত্যেকটিই আপন মহিমায় উজ্জ্বল।

তিনি কলকাতা এবং কলকাতার বাইরে থেকেও অজস্র পুরস্কার পেয়েছেন। যার মধ্যে উল্লেখ্য ভুবনমোহিনী স্বর্ণপদক, মতি নন্দী পুরস্কার, সাহিত্য সেতু পুরস্কার, শৈলজারঞ্জন স্মৃতি পুরস্কার, শর‍ৎ পুরস্কার, দীনেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার, তারাশঙ্কর পুরস্কার, ভারত নির্মাণ পুরস্কার, নানজানাগুদু থিরুমালাম্বা জাতীয় পুরস্কার প্রভৃতি।

তাঁর উপন্যাসগুলির মধ্যে কাচের দেওয়াল, কাছের মানুষ, নীল ঘূর্ণি, অলীক সুখ, হেমন্তের পাখি, গভীর অসুখ, উড়ো মেঘ, ছেড়াতার, আলোছায়া, অন্য বসন্ত, পরবাস, আমি রাইকিশোরী, মিতিন মাসি প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।