১৮৫৯ সালের আজকের দিনটা, অর্থাৎ ২২মে দিনটাতে যে ছেলেটি জন্মাল, সে যে বিশ্ব সাহিত্য ইতিহাসের একটি ধারা স্বয়ং নিজে হাতে নিয়ন্ত্রণ করবে, তা তার বাবা চার্লস কিংবা মা মেরি কেউই বুঝে উঠতে পারেননি। আর বুঝবেন কী করে! চার্লস তো নেশার ঘোরে বেহুঁশ থাকতেন প্রায় অর্ধেক সময়।

ছেলের নাম আর্থার ডয়েল। সেন্ট মেরি'স ক্যাথিড্রাল-এ ব্যাপ্টিজম-এর সময়ে তাঁর পুরো নাম দাঁড়ায় আর্থার ইগনেশিয়াস কোনান। সুতরাং পুরোটাই তাঁর নাম। ডয়েল শুধু পদবি। যদিও কলেজে যাওয়ার পর ইগনেশিয়াস কে বাদ দিয়ে দেন তিনি নিজেই।

ছেলে পড়াশোনায় ভালো। পড়তে এলেন ডাক্তারি। সেখানে আলাপ হল মেডিসিনের বরিষ্ঠ অধ্যাপক ডক্টর জোসেফ বেল-এর সঙ্গে। ফরেন্সিক সায়েন্স নামে এক নতুন বিভাগের জন্ম দিয়েছেন বেল। এই অধ্যাপকের প্রতি তরুণ ডয়েলের মুগ্ধতা অপরিসীম। তাঁর উপস্থিতিই ডয়েলকে প্রাণিত করেছে পরবর্তীতে এক কালজয়ী চরিত্র নির্মাণে। নাম তার শার্লক হোমস।

১৮৮৭ সালে জন্ম নিয়ে আজ ২০১৮ সাল, এই ১৩১ বছরেও যে চরিত্রের জনপ্রিয়তায় এতটুকু ভাটা পড়েনি, তাকে তার স্রষ্টা নিজেই একসময় মেরে ফেলেছিলেন, ১৮৯৩ সালে। 'দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ফাইনাল প্রবলেম' কাহিনিতে সৃষ্টির থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন স্রষ্টা নিজেই। পরে অবশ্য পাঠকের বিপুল চাহিদায় এবং তাঁর নিজস্ব কিছু আর্থিক সমস্যার কারণে এবার তাকে বাঁচিয়ে তুলতে হয়। কিন্তু কেন এই নিষ্কৃতির সিদ্ধান্ত? কোনান ডয়েল পরে বলেছিলেন, ''যদি সম্ভব হত, কখনই আর শার্লক হোমস-কে ফিরিয়ে আনতাম না। অন্তত বেশ কিছু বছরের জন্য তো নয়ই। কারণ এই চরিত্রটা নিয়ে এত বেশি চর্বণ হয়েছে যে, আমার মনে হয়, একে যা দেওয়ার, তার থেকে অনেক বেশি দেওয়া হয়ে গেছে। সব দেওয়া আমার ফুরিয়ে গেছে। নতুন করে আর কিছু দেওয়ার বাকি নেই।" কিন্তু নিয়তির ইচ্ছে অন্যরকম। তাই তাঁর নিজের অনিচ্ছা সত্ত্বেও শার্লক হোমস আজও বিজয়গর্বে এগিয়ে চলেছে রমরম করে।

অবশ্য এমনতর অনিচ্ছে স্বাভাবিক অনেকটা। কারণ লিখতে হবে বলেই তো আর লিখতে শুরু করেননি। লন্ডনে অপথালমোলজি প্র্যাক্টিস করবেন বলে চেম্বার খুলে বসেছিলেন। কপাল এমনই, একটা রোগীও জুটল না। একটা নয়, মানে একটাও নয়। ফাঁকা চেম্বারে কী আর করেন, গল্প লিখতে শুরু করে দিলেন কোনান ডয়েল। সময়টা তো কাটাতে হবে। 
ভাগ্যিস কোনো রোগী আসেনি!

লিখতে লিখতে লেখক হওয়ার শখ চেপেছিল নির্ঘাত। তাই ২৩ বছর বয়সে এক পাণ্ডুলিপি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন কোনো প্রকাশকের কাছে। বই হয়ে বেরনোর আশায়। কিন্তু সে পাণ্ডুলিপি গেল হারিয়ে। মানে ডাক থেকেই হারাল। সেটা আর প্রকাশকের কাছে পৌছয়নি। ডয়েল কিন্তু ছাড়ার পাত্র নন। স্মৃতি থেকেই ১৫০ পাতার গল্প উদ্ধার করে করে ফের লিখতে শুরু করে দিলেন। তবে সে কাজ আর শেষ করতে পারেননি। কারণ তার মধ্যেই লিখতে শুরু করেন শার্লক হোমস

তাঁর নিজের লেখার প্রভাব নিশ্চই তাঁর নিজের ওপরই সবচেয়ে বেশি পড়েছিল। নইলে হোমসের বিশ্লেষণের কায়দায় ডয়েল নিজেও একাধিকবার রহস্য সমাধানে নেমে পড়েছেন নিজেই। অনেকগুলো ঘটনায় অপরাধী আর তার মনস্তত্ত্ব ভেদ করতে চেষ্টা করেছেন ডয়েল। কয়েকটি ক্ষেত্রে সফলও হয়েছেন। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বোধহয় জ্যাক দ্য রিপার রহস্য। ডয়েল তাঁর তীক্ষ্ণ অনুসন্ধানী বুদ্ধিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হন যে, আসল জ্যাক দ্য রিপার কোনো পুরুষ নয়। বরং এক মহিলা। নিজেকে সে আয়া বা ধাত্রী হিসেবে প্রতিপন্ন করেছে। আর এই কারণেই অতি সহজে মহিলাদের আস্থা অর্জন করেছে সে। ফলে তার পওশাকে রক্তের দাগ থাকাটাও খুব স্বাভাবিক বলে মনে করেছে মহিলারা।

 
যদিও এই সিদ্ধান্ত অমীমাংসিত থেকে গেছে। কিন্তু যদি কোনোভাবে এই সিদ্ধান্ত ধরে ধরে সারা বিশ্বের সবচেয়ে জটিল আর দুর্বোধ্য রহস্যের সমাধানটা এসে যেত, তবে হয়তো গোয়েন্দাগিরিতে নিজের সৃষ্টিকে অতিক্রম করে যেতেন স্রষ্টা আর্থার কোনান ডয়েল