হরিদাস চট্টোপাধ্যায় ছিলেন সম্পন্ন কুলীন ব্রাহ্মণ | তাও তিনি নিজের ছেলেকে মতিলাল শীলের ফ্রি স্কুলে দিতে দ্বিধা করেননি | ১৯০৭ সালে কলকাতার সেই স্কুল থেকেই এন্ট্রান্স উত্তীর্ণ হলেন হরিদাস-পুত্র সুনীতিকুমার |

আশৈশব তীক্ষ্ণ মেধাবী সুনীতিকুমার এন্ট্রান্সে ( তখনকার স্কুল ফাইনাল)পেয়েছিলেন ষষ্ঠ স্থান | স্কটিশ চার্চ কলেজ থেকে FA বা প্রি ইউনিভার্সিটি উত্তীর্ণ হয়েছিলেন মেধা তালিকায় তৃতীয় স্থান পেয়ে |  

এরপর মেধাতালিকায় শীর্ষ স্থান | যখন সুনীতিকুমার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১১ সালে পাশ করলেন ইংরেজিতে সাম্মানিক স্নাতকোত্তর | একই ফল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তরেও | সে বছরেই সুনীতিকুমার যোগ দিয়েছিলেন অধ্যাপনায়‚ বিদ্যাসাগর কলেজে | পড়ুয়াদের সঙ্গে ২৩ বছর বয়সী অধ্যাপকের বয়সের ব্যবধান সামান্যই | এই প্রতিষ্ঠানে তাঁর সহকর্মী ছিলেন নাট্যাচার্য শিশির কুমার ভাদুড়ী |

কলেজে এক বছর পড়াতে না পড়াতেই সুনীতিকুমার ডাক পেলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে | ৫ বছর সেখানে সুনামের সঙ্গে শিক্ষকতা করার পরে তিনি আবার ফিরে গেলেন ছাত্রাবস্থায় | পাড়ি দিলেন ব্রিটেন | লন্ডন ইউনিভার্সিটিতে পড়লেন ফোনোলজি‚ প্রাকৃত‚ ইন্দো-ইউরোপীয়ান লিঙ্গুইস্টিকস‚ পার্সিয়ান‚ ওল্ড আইরিশ‚ গথিক এবং আরও অন্য ভাষা | এরপর প্যারিসে গিয়ে গবেষণা করেছিলেন স্লাভ‚ ইন্দো ইউরোপীয়ান লিঙ্গুইস্টিক্স‚ গ্রীক ও ল্যাটিন ভাষায় | তাঁর শিক্ষক ছিলেন বিশ্ববন্দিত ভাষাবিদ জুল ব্লোশ | তিন বছর পরে যখন দেশে ফিরলেন তখন তিনি ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় | তাঁকে এই উপাধি দিয়েছিলেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর|

১৯২২-১৯৫২ অবধি তাঁর অধ্যাপনায় সমৃদ্ধ হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় |অবসর গ্রহণের পরেও তিনি অলঙ্কৃত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নানা পদ |হয়েছিলেন বিশ্বকবির সফরসঙ্গীও | যখন কবি গিয়েছিলেন মালয়‚ সুমাত্রা‚জাভা‚ বালি-সহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া সফরে | আচার্য সেখানে ভারতীয় ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে বক্তব্য রেখেছিলেন | সাহিত্য অ্যাকাডেমির প্রেসিডেন্ট পদও অলঙ্কৃত করেছেন ভাষাচার্য |

ভাষা ও সাহিত্য দু দিকেই বহু আকর গ্রন্থের প্রণেতা আচার্য সুনীতিকুমার |তার মধ্যে বলতেই হয় বাংলা ভাষাতত্ত্বের ভূমিকা‚ ভারতের ভাষা ও ভাষা সমস্যা‚ জাতি সংস্কৃতি সাহিত্য‚ সংস্কৃতি কী‚ বইগুলোর নাম | পাশাপাশি তাঁর অভিজ্ঞতা ও ভ্রমণ কাহিনী সমৃদ্ধ বই হল রবীন্দ্র সঙ্গমে‚ইউরোপ ভ্রমণ‚ দ্বীপময় ভারত এবং পশ্চিমের যাত্রী |

এই ভাষা-সাধকের জন্ম হয়েছিল ১৮৯০-এর ২৬ নভেম্বর‚ হাওড়া জেলায় |প্রয়াত হন ২৯ মে‚ ১৯৭৭‚ হুগলি নদীর এ পারে‚ কলকাতায় | জীবনের শেষ দিন অবধি নিজের উপলব্ধি প্রকাশে ছিলেন দ্বিধাহীন | ১৯৭৬ সালে‚ প্রয়াণের ঠিক আগের বছর এশিয়াটিক সোসাইটিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে অশীতিপর আচার্য বলেছিলেন‚ রামায়ণ মহাকাব্যের উৎস বৌদ্ধ সাহিত্যের দশরথ জাতক| তাঁর এই মন্তব্যে তীব্র বিতর্ক হয় | কিন্তু স্বমত থেকে বিচ্যুত হননি ভাষাচার্য | বস্তুত তিনি ছিলেন বটবৃক্ষের মতো | ভাষা থেকে জ্ঞান-রস সিঞ্চন করে তাকেই আচ্ছাদিত করে রেখেছিলেন আজীবন |

 

- পিঙ্কি গাঙ্গুলি

লেখিকা সাহিত্যের ছাত্রী। অবসরে বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে পড়া এবং লেখার শখ