আমার তখন খুব ছোট বয়স, পূজাবার্ষিকী তে একটা ছোট্ট গল্প “ডাকাতের কবলে আমি” পড়ে খুব উত্তেজিত, সেইদিন প্রথম জানলাম এই লেখিকা মায়ের সুধুমাসী। তারপর সেই সুধুমাসীর তথা প্রখ্যাত লেখিকা আশাপূর্ণা দেবীর বহু উপন্যাস ছোট গল্প পড়েছি, দিদির বিয়েতে সারাদিন এই মানুষটিকে কাছ থেকে দেখেছি, দেখেছি বিয়ের অনুষ্ঠানে নিজের বিখ্যাত পরিচয় দূরে সরিয়ে রেখে আত্নীয়দের আন্তরিকতার সঙ্গে আপ্যায়ন করার এক অদ্ভুত সহজাত ক্ষমতা।

একবার আমি তখন হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষা পাশ করে কয়েকজন বন্ধু মিলে একটি লিটলম্যাগ প্রকাশ করছি, নামটা বোধহয় ছিল শপথ, সেই সময় একজন বন্ধুর সঙ্গে গেছিলাম তাঁর গড়িয়ার বাড়িতে একটি গল্প নেবার জন্য, উনি কোনদিন কাউকে ফেরাননি, তাই বোনঝির ছেলেকেও ফেরাবেন না সেটা জানতাম, কিন্তু উনি একটি শর্ত দিয়েছিলেন, সামনের বার তোমাদের লেখা দেখতে চাই। আমি শুধু বলেছিলাম, আজও মনে আছে… অভিজ্ঞতা না থাকলে লেখা হয় না। মনে আছে খুব খুশি হয়েছিলেন।

মায়ের কাছে শুনেছিলাম তখনকার বিখ্যাত পত্রিকা ভারতী তে তাঁর লেখা ছাপা হয়েছিল, তখন ওনার বয়স সম্ভবত দশ বছর, রবীন্দ্রনাথ তাঁর লেখা পড়ে চিঠি দিয়েছিলেন, সেটাই তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা। তাঁর বিখ্যাত ট্রিলজি র সুবর্ণলতা চরিত্র তার নিজের মায়ের জীবনের আঙ্গিকে লেখা তা আজ আমরা সবাই জানি, কিন্তু সেদিন তাঁর বাড়িতে আমাকে বলেছেন, ওরে শোন শুধু মা নয়, মা ঠাকুমা, এমনকী আমাদের পড়শি যে মানুষরা ছিলেন তাদের সবার ছায়া এর মধ্য আছে, তবে মায়ের ভিতরের কষ্টটা যতটা বুঝেছি সেটাই লেখার মধ্য বেশি করে এসেছে। ওনার পুঁথিগত শিক্ষা বেশি ছিল না। কারণ তৎকালীন উত্তর কলকাতার বনেদি পরিবারের মেয়েদের স্কুলে গিয়ে পড়াশোনা করার চল ছিল না, এই আক্ষেপ তাঁর সারা জীবন ছিল। তাঁর খুব ইচ্ছে ছিল দাদা বা ভাইয়ের মতন স্কুলে যাবেন।

কিন্তু তা আর হল না। খুব ছোট বয়সে বিয়ে হয়ে শ্বশুরবাড়ি চলে গিয়ে, তাদের মন জুগিয়ে চলেও নিজের লেখা চালিয়ে যাওয়া সত্যি কষ্টসাধ্য ছিল ওই সময়। কিন্তু তাঁর স্বামী, মানে আমাদের কালীদাদুর ঐকান্তিক প্রচেষ্টা তাঁকে লেখিকা হিসেবে বিশ্বের দরবারে পৌঁছে দিতে সাহায্য করেছিল, সবচেয়ে শুনলে আশ্চর্য হতে হয়, শাশুড়ির ইচ্ছের বিরুদ্ধে গিয়ে উনি কোনদিন ব্লাউস পর্যন্ত ব্যবহার করেননি। যখন উনি খুব নাম করেছেন, লেখক প্রকাশকরা বাড়িতে আসছেন তখন উনি তাদের সামনে শাড়ির ওপর সুতির শাল চাপিয়ে নিতেন।

আমি তাঁর কাছে খুব বেশি যাবার সৌভাগ্য হয়নি, আমার দিদিমা রত্নামালা দেবী, তাঁর রতনদি দিল্লি থেকে এলে আমি একবার বিকেলে গেছিলাম দিদিমাকে আনতে, উনি দেখলাম খাটের ওপর বুকে বালিশ দিয়ে উপুড় হয়ে এক মনে লিখে চলেছেন। মনে আছে উপন্যাসটা পরে দেশ পূজা বার্ষিকীতে বেরিয়েছিল, “ওরা বড় হয়ে গেল’। উনিজানতে চেয়েছিলেন আমরা কলেজের বন্ধুদের সঙ্গে কীভাবে মেলামেশা করি।আজ মনে নেই ঠিক কী বলেছিলাম, কিন্তু এইটুকু মনে আছে, কী আগ্রহ সহকারে আমার উত্তর শুনেছিলেন। ওনার আমার বয়সী নাতনি ছিল সেও তখন আমার মতন কলেজে পড়ত, নিশ্চয় তার থেকেও শুনেছেন, নিজে কোনদিন কলেজ যাননি, অথচ তাদের মানসিকতা কী সুন্দর ফুটিয়ে তুলতেন তাঁর লেখাতে।

নারীশিক্ষার প্রতি তাঁর আগ্রহ কতখানি ছিল তা তার লেখার মধ্য দিয়ে অনেক জেনেছি, কিন্ত নিজের পরিবারে এই শিক্ষা সচেতনতা কতটা আন্তরিক দেখি, যখন তাঁর বউমাকে ঘরে আনেন সেদিন তিনি ক্লাস টেনের ছাত্রী ছিলেন। তাঁর ঐকান্তিক চেষ্টায় সেদিনের সেই ছাত্রী পরবর্তী কালে ইংলিশ নিয়ে পিএইচডি. করে যোগমায়া দেবী কলেজে বিভাগীয় প্রধান হয়েছিলেন।

আমার সঙ্গে শেষ বার দেখা ১৯৮৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে, আমার মামার মেয়ের বিয়ের দিন সন্ধে বেলা।। উনি তখন জ্ঞানপীঠ পেয়েছেন। কিন্তু আনন্দের দিনে তাঁর পরম আত্মীয়, লেখিকা হয়ে ওঠার পিছনে যাঁর উৎসাহ সবচেয়ে বেশি ছিল, তাঁর স্বামী কালিদাস গুপ্ত পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন, সম্ভবত ১৯৭৯ সালের মার্চ মাসে।

জ্ঞানপীঠ পাওয়ার পর সেই সামাজিক অনুষ্ঠানে সবার সঙ্গে দেখা হয়েছে, উনি আত্মীয় পরিজনদের নিয়ে গল্প করছেন, সেই সময় কেউ একজন বলেছিল, সুধুমাসী, এই পুরস্কার তোমার সম্মান বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তোমাকে খুব ধনী করে দিল।

উনি উত্তর দিয়েছিলেন, তোরা তো জানিস, আমি জীবনে অনেক পুরস্কার পেয়েছি, তাই কোন কিছুই আর আলাদা করে টানে না। কিন্তু এই পুরস্কার আর্থিক কারণে আমার খুব দরকার ছিল। আসলে কালী দাদুর চিকিৎসার জন্য অনেক ধার হয়ে গেছিল বলে শোনা যায়।

সাহিত্যিক গজেন্দ্র কুমার মিত্র ওনাকে দিদি বলে ডাকতেন। ওই সময় শুনেছি ওনার অনেক সাহায্য নিতে হয়েছিল, শান্তিনিকেতনের বাড়িও বিক্রি করে দিয়েছিলেন, তাই পুরস্কারের ওই অর্থমূল্য তাঁকে সেই সময় তাঁকে দেনা মেটাতে সাহায্য করেছিল।

বরাবরের আধুনিক মনস্ক, সংসারে সংস্কারবাদী, আত্মীয়দের প্রিয়, সাংসারিক কলহ বিবাদ থেকে বহু যোজন দূরে থাকা মানুষটির লেখায় উঠে এসেছে সমস্ত সাংসারিক বিবাদ। এটা কিন্তু ভারি আশ্চর্যের।

মায়ের মুখে শুনেছিলাম, তাঁর এক আত্নীয়ের বিয়ের দিন বরপক্ষ বর তুলে নিয়ে চলে যাচ্ছিল, উনি আর ওনার আরেক বোন মিলে রাস্তায় দৌড়ে তাদের ফিরিয়ে এনেছিলেন। তখন কিন্তু ওনার খ্যাতি সারা বাংলায়। হিন্দিতেও অনেক গল্প তখন সিনেমা হয়েছিল, কিন্তু পরিবারের মান বাঁচাতে সে সময় কোনো কুন্ঠা হয়নি। এটা বলার একটাই কারন উনি সরবদিকেই পরিবার কেন্দ্রিক ছিলেন, তাই আটপৌরে জীবনের কাহিনি তাঁর লেখাতে এতটা বাস্তব রূপ পেত। র একটা কথা মনে পড়ছে। আমার বোনের বিয়ের নিমন্ত্রণ করতে বাবার সঙ্গে ওনার বাড়িতে গেছি। বহুদিন বাদে এসেছি। তার ওপর সঙ্গে বাড়ির জামাই রয়েছেন। উনি তখন পুজো করছিলেন। সন্ধে বেলা, গরদের শাড়ি পরে পুজো থেকে উঠে আমাদের সঙ্গে গল্প করতে বসলেন। নুপুর মামী অনেক মিষ্টি লুচি তরকারি নিয়ে এসেছেন, অত্যন্ত মহিয়সী ও বিদূষী মহিলা ছিলেন তিনি। আমি খাওয়া সেরে হাত ধুয়ে একটা বই নিয়ে রাস্তার ধারে বারান্দায় বসে পড়ছি, উনি বইটা দেখে বললেন, ‘এই গল্পটা তোর মা আর আমার মেয়েকে নিয়ে লেখা’। আমার মা আর আশা দিদার মেয়ে রেনুমাসি গলায় গলায় বন্ধু ছিলেন। আমি বাড়ি যাবার সময় আবার হাত ধুয়ে নমস্কার করছি, উনি বললেন, ‘আবার হাত ধুলি, তুই দেখছি তোর মায়ের মতন’।রবীন্দ্রনাথের পর বোধহয় এই একজন মানুষই ছিলেন, যাঁর স্কুল কলেজের শিক্ষা নেই, কিন্তু বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সাম্মানিক ডিলিট দিয়েছে। তবু তিনি থেকে গেছেন সেই বরাবরের আটপৌরে, ঘরোয়া।

সেই মহান লেখিকা, আমার মায়ের সুধুমাসির মৃত্যুর সময় যেতে পারিনি। ইচ্ছে করেই যাওয়া হয়নি। বহু মানুষের ভিড়ে চিরশায়িত সেই অমর মানুষটিকে দেখতে চাইনি কখনও।

দেবাশিস  গুপ্ত

deba