নবনীতা দেবসেন।।

প্রকাশক: দে’জ পাবলিশিং।।

মূল্য: ১৮০ টাকা।।

 

     বই পড়া আমার নেশা শুধু নয়, ধর্মও বটে। বই না পড়লে লেখার উৎকর্ষ  বাড়ে না। বিদগ্ধ লেখকের লেখার কৌশল, তাঁদের চিন্তা ভাবনা, শব্দ বিন্যাস কেমন করে রূপ ধরছে  -- জানতে হলে পড়তে তো হবেই। বই পড়ি না অথচ রোজ একটা লিখি --- এ সম্ভব কেমন করে তা আমার জানা নেই। 

    নবনীতাদির  লেখার ভক্ত ছোটবেলা থেকেই। সেদিন হঠাৎ করে আবার পড়ে ফেললাম " ভালোবাসার বারান্দা"। আবার মুগ্ধ হলাম। বারবার কেন এই মুগ্ধতা? না রগরগে প্রেম না ভূত না বাসী ডালের টক গন্ধের মতো কোনো বিষণ্নতা। তবে? 

   একটু জ্ঞান দিতে বাধ্য হচ্ছি, সেটা হলো প্রবন্ধ আর ব্যক্তিগত প্রবন্ধ সাহিত্যের বিস্তৃত ক্ষেত্রে দুই ভিন্ন জাতের রচনা। প্রবন্ধে যে আলোচনা একান্তভাবে বিষয়বস্তুতেই সীমাবদ্ধ, রসরচনায় সে আলোচনা লেখকের আমেজি মনের জারক রসে স্বকীয় স্বাতন্ত্র লাভ করে। পাঠকের মনে সে তার বক্তব্য বিষয়কে এমন ভাবে তুলে ধরে , বোঝা যায়একটা বুদ্ধিদীপ্ত মনের কলা কৌশল সজীব হৃদয়ের স্পর্শে যা অনুপ্রাণিত। এই বিশেষ আকর্ষণ থাকে বলেই এ জাতীয় রচনা আজ সাহিত্যের দরবারে বিশিষ্ট আসন অধিকার করে বসেছে। এই রচনাকে তাই রসসাহিত্য বলা হয়।

   ধান ভানতে শিবের গীত মনে হলেও, নবনীতার ভালোবাসার বারান্দার প্রতি ছত্রে ঝলমল করছে  লেখিকার ব্যক্তিত্বের বিভা।  ভূমিকায় লেখিকা বলেছেন ," আমার প্রত্যেক দিনের বাঁচার গল্প এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে এই খানে। যখন যেটা বলতে ইছছে করেছে ,,,,,,,সে ভাবেই তাকে আসতে দিয়েছি । মন খুলে। বারান্দায় দাঁড়ালে আমি দেখতে পাই সমগ্র পৃথিবী , আমার সারা জীবন।"

         বারান্দায় বসে বিশ্ব দর্শন যে সাহিত্য করাতে পারে তাকে ভালো না বেসে পারা যায়? যুক্তি জাল নয়, আনন্দ আর সৃষ্টি বাসনার কাছে সত্য নিষ্ঠ থাকাই হলো এই লেখার মূল কথা। 

     পাতা উল্টে প্রথম লেখায় চোখ আটকে যায় নবনীতার ঝরঝরে ভাষায় লেখা,"  এদিকে আমার চরিত্রের একটা প্রবল দুর্বলতা আছে, আমি পসিটিভ থিংকিংয়ে বিশ্বাস করি। ,,,,,,তাই জীবনের প্রবলতম বিশ্বাস হননের মুহূর্তেও আমি সেই কবির বাক্য ইষ্ট মন্ত্রের মতো জপ করি," মানুষের উপরে বিশ্বাস হারানো পাপ। ' তাতে মাথার উপর আকাশটা সবসময় উন্মুক্ত থাকে।"

   

     আমি মুগ্ধ। এ কার লেখা? এ তো আমার কথা! লেখক যদি নিজে সত্যদ্রষ্টা না হোন তার লেখা আমার বুকে প্রতিধ্বনি হয় কী করে?

      ভালোবাসার বারান্দায় কোনো গল্প নেই। কখনো যাদবপুর উনিভার্সিটি র স্মৃতি কোথাও কবি শঙ্খ ঘোষ কে নিয়ে শোলে সিনেমা দেখতে যাবার কথা, যাদবপুরের বিখ্যাত এপ্রিল লিস্টে অমর্ত্য সেনের নামের পাশে ছাত্রদের লিখে রাখা টিঙ্কু ঠাকুর , তারপরে দেখি  কিভাবে আঠারো বছর বয়সে হৃদয় ভঙ্গের সময় পাশে ছিলো যে বন্ধুরা তাদের কথা।

   লেখিকার পাড়ার গল্প তো আমাদের চির চেনা। পাড়ায় চলছে মিউজিক কনফারেন্স। সেখানে অচেনা তরুণ তরুণীর একটুকু ছোয়াঁ লাগে একটুকু কথা শুনি র সূত্রপাত, সেই দিয়ে হয়তো দিনের পর দিন রাতের পর রাত কেটে গেলো। হয়তো নামটাই জানা হলো না। 

    এই সব ঘটনা আমিও তো জানি। শুধু এমন করে বলতে পারিনা। নবনীতা কত উঁচু মাপের কথা শিল্পী 

ভালবাসার বারান্দা তার আরো একটি উদাহরণ।

   এক মিনিট মন চোখ কিছুই সরানোর উপায় নেই ,অথচ বিষয় সব সাধারণ কিন্তু বোধ খুব গভীর। যা জীবনের ঝুঁটি ধরে নেড়ে দেয়। সহজ করে দর্শন জানতে হলে , বেঁচে থাকার মূল মন্ত্র পড়তে হলে ভালোবাসার বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াতেই হবে। 

*

নন্দীগ্রামের কথা বলেছেন দিদি ৪২ পাতায়। বলেছেন,  মানুষের কাছ থেকে জমি নেবার সময় তার মনের দিকে তাকাও। এ কোন অসম্ভব কথা বললেন নবনীতা?  রাজনৈতিক নেতারা ক্ষমতা বোঝে মন বুঝবে কেনো ? তারপরে  দিদির কলম কিন্তু আরো তীক্ষ্ণ পরিবেশ রক্ষার জন্য। কলকাতায় ফ্ল্যাট বেড়ে যাচ্ছে। ডিপ টিউবওয়েল বসছে । তার ফলে জলাভাব হবে শহরে। বায়ুদূষণ নিয়েও বলছেন , চিন্তায় পড়েছেন প্রিয় শহরের জন্য।

 ভালোবাসার বারান্দার পাড়া পড়শী পর্যায়টি আমাদের মনের মতো। যদিও এখন  না আছে পাড়া না মেলে প্রতিবেশী। কলকাতা জুড়ে বৃদ্ধ বৃদ্ধার দল। ছেলে মেয়ে সব বিদেশে। নবনীতার প্রিয় প্রতিবেশী এক সতেজ নিমগাছ। সে  যখন কাটা পড়ে প্রোমোটারের হাতে, বিষণ্ন হয়ে যায় মন। জ্যোতি বসুর বাড়ির গাছের পাগলা কোকিল, পাড়ার চিল ফ্যামিলী,শোবার ঘরের সামনে ঝিমন্ত সুন্দরী দুধের মতো সাদা লক্ষী পেঁচা, পাড়ার সবার চোখের মণি সারমেয় - লালী। সব আমাদের পরিচিত। ভালোবাসার বারান্দায় বসে, চা খাচ্ছি  আমরাও। বইয়ের বর্ণনা এমনই জীবন্ত। 

    ছবির পর ছবি, পাতায় পাতায় ছবি, এ বই না পড়লে জীবনের জানা বাকি রয়ে যাবে অনেক। 

       পাঠক আর লেখকের এই আলাপচারিতায় লেখিকা নবনীতা স্পষ্ট হয়ে ওঠেন। তুচ্ছে র মধ্যেও কী বিরাটের মহিমা অঙ্কুরিত হয়ে আছে, নবনীতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন।

   পড়ার সময় বোঝা যায় এ লেখা কষ্ট কল্পিত নয়। ভাষা সহজ সাবলীল। চলার গতিতে আছে এক নিবিড় ছন্দ। সময় কাল কে ছোয়াঁ যায়। ক্ল্যাসিক সাহিত্যের মতো নবনীতা নিজের সময়কে ছাপিয়ে গেছেন। কোনো নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছনোর তাড়া নেই। যুক্তিতর্কের শাসন উদ্যত করে পাঠক কে কোনও বিশেষ একটি তত্ত্ব বুঝিয়ে দেবার দৃঢ় সংকল্প বা মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ নেই। যেন একটা মধুর আবেগ ছড়িয়ে আছে পাতায় পাতায়। জীবনের সহজ ভাব গুলো আবেগ একসঙ্গে মেলা করে আছে।

  নবনীতার বারান্দায় বসে উন্মুক্ত হয় নতুন চিন্তার বাতায়ন। যদিও নবনীতা নিজেই বলেন--" মাত্র একটি করে জীবন দিয়ে সৃষ্টিকর্তা আমাদের পাঠিয়েছেন , সেই জীবনটার সদ্ব্যবহার করছি কি?সারা পৃথিবীর উন্নতির জন্য কিছু করি না করি , নিজেদের প্রতি পদে অনুভব করা অপূর্ণতা ঘোচাতে , সমাজ মানসে জরুরি কোনো বদল আনার চেষ্টা করে উঠতে পেরেছি কি?" তারপরে যেটা বললেন নবনীতা দি, জীবন দর্শনের এর চেয়ে বড়ো কথা আর কিছু হয় না --" আমাদের প্রত্যেকেরই সেই কাঠবিড়ালীর মতো কিছু পাথর বহন করে আনার শক্তি আছে, সমুদ্র লঙ্ঘনও যাতে অসম্ভব থাকে না।" এর পরে 

      ভালোবাসার বারান্দা সম্পর্কে আর কিছু বলার অপেক্ষা রাখেনা। আমার পড়া একটি অন্যতম শ্রেষ্ঠ বই সম্পর্কে কিছু লিখতে পেরে খুব পূর্ণ মনে হচ্ছে নিজেকে।