পোশাক পরিকল্পনায় সত্যজিৎ

 

১.
‘সোনার কেল্লা’ সিনেমায় ভুয়া প্যারাসাইকোলোজিস্ট ড. হাজরার সহকর্মী কামু মুখার্জি। আসলে সে ভিলেন। তাই তার পোশাকও তেমন। গায়ে সিল্কের চক্রাবক্রা শার্ট। হাতে মদের গ্লাস, সামনে লুডুর বোর্ড, আহা! কী কম্বিনেশন! বিশেষ করে তাসের ছবি আঁকা কামুর সেই ইউনিক জামাটা — এমন জামা যে সত্যজিৎ কোত্থেকে যোগাড় করলেন সেটাই এক গবেষণার বিষয় হতে পারে।

২.
‘জয় বাবা ফেলুনাথ’ ছবিতে ধুতি, পাঞ্জাবি, জ্যাকেট ও বিদ্যাসাগরী চটি ছাড়া লালমোহন বাবুকে চিন্তাই করা যায় না। সন্তোষ দত্ত এই পোশাকে লালমোহন বাবু হিশেবে চিরদিনের মতো সবার মনে গেঁথে আছেন। বিকল্প ফেলুদার কথা ভাবা যায়, ভাবা যায় বিকল্প তোপসের কথাও; কিন্তু বিকল্প জটায়ু? অসম্ভব।

৩.
‘কাপুরুষ’ ছবির একটি দৃশ্যে দেখা যায় মাধবী প্যাশেন্স খেলছেন। তখন তার পরনে সফট সিল্কের শাড়ি ও পাথরের গয়না। এমন পরিশীলিত পোশাক তখনকার দিনে বিরল। ছাপা সিল্কের শাড়ির ফ্যাশনও তখন নতুন।

৪.
‘অরণ্যের দিনরাত্রি’ সিনেমায় সিমি গারোয়াল সাঁওতাল যুবতী। তার ফর্শা শরীরের কালো মেকাপ শ্রীরায়েরই নাকি দেয়া! পেটিকোট-ব্লাউজ ছাড়া শাড়ি আর রূপার গয়নায় তাকে যেমন লেগেছে, এখন পর্যন্ত কোনো মিস্ ওয়ার্ল্ডকেও তেমন দুর্ধর্ষ লাগেনি।

৫.
‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছায়াছবিটাই রায়ের প্রথম রঙিন ছবি। সেখানে অলকানন্দা রায়ের মণি রায়বাহাদুরকন্যা। সিল্কের শাড়ির সাথে মেয়েদের কোট, পায়ে পাম্প-শ্যু। টেনে-খোঁপা-বাঁধা কানে ঝোলানো সোনার দুল। খুবই চমৎকার। পুরো ছবিতে এই এক পোশাকই পরে থাকেন অলকানন্দা; — অবশ্য উপায়ও ছিল না, ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ ছবির সময়কালই স্রেফ একটি বিকাল পর্যন্ত বিস্তৃত।

৬.
‘অভিযান’ ম্যুভিতে ওয়াহিদা রেহমান পরেছেন ঘাগরা, চোলি আর ওড়না। গালে ঝোলানো বড় রাজস্থানী দুল। তার পরা ঘাগরা-চোলি কিন্তু হিন্দি সিনেমার সেইসব ছোট কাচ-বসানো কিছু নয়, একেবারেই রিয়্যালিস্টিক।

৭.
‘সমাপ্তি’ সিনেমায় অপর্ণা সেন — তখনও দাশগুপ্ত অবশ্য — রবীন্দ্রনাথের মৃন্ময়ী। ব্লাউজছাড়া শাড়ি, নাকে ফুল আর জবজবে করে তেল দিয়ে টেনে চুল বাঁধা তার। দস্যি মেয়ের দারুণ সাজ।

৮.
‘মহানগর’ ম্যুভিতে চাকরিরত মাধবী আধুনিক হয়ে উঠেছেন। এক-সময় দেখা যায় পাৎলা আর আধুনিক ডিজাইনের ব্লাউজের নিচে সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাটারফ্লাই ব্রা। পোশাক পরিকল্পনা সত্যজিৎ রায়ের।

৯.
‘সতরঞ্জ-কে-খিলাড়ি’ সিনেমার পোশাক পরিকল্পনা আলাদাভাবেই লক্ষণীয়। কস্ট্যুম ডিটেইলস্ নিয়ে এদেশে সত্যজিৎ রায়ের মতো ভাবুক বিরল। বাদশা ওয়াজেদ আলী শাহ্ যখন ইংরেজদের হাতে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য, তখন সাঈদ জাফরী ও সঞ্জীব কুমার দাবা খেলতে ব্যস্ত। পরনে তাদের জমকালো শাল, মেরজাই, টুপি ও নাগরা।

১০.
‘ঘরে-বাইরে’ সিনেমায় বিচিত্র রকমের নান্দনিক ও দৃশ্যানুগ আলোয়ান বা শালের ব্যবহার দেখা যায়। আদ্দির, সিল্ক, খদ্দর, পাঞ্জাবি আর কাশ্মিরি সহ নানান রকমের শাল পরেছেন ভিক্টর ব্যানার্জি। স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত ব্লাউজ ট্রায়াল দেবার দৃশ্যে পরেন পাঁচটারও বেশি ব্লাউজ। প্রত্যেকটাই দারুণ, প্রত্যেকটাই নয়নজুড়ানো, প্রত্যেকটাই সত্যজিৎকৃত ডিজাইন।

১১.
‘হীরক রাজার দেশে’ সিনেমার নামচরিত্র হীরক রাজা স্বৈরাচারী। তার চরিত্রের কালো দিকের কথা ভেবেই সম্ভবত গাঢ় রঙের পোশাক পরানো হয়েছে ক্যারেক্টারটায়। হীরক রাজার ভূমিকায় অভিনয় করেছেন উৎপল দত্ত।

১২.
‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ সিনেমায় জাদুকর বরফির পোশাকের পুরোটাই সত্যজিৎ রায়ের করা। অদ্ভুত, আজব এবং মৌলিক।

 

সিনেমার নাম পথের পাঁচালী

 

পথের পাঁচালী মানেই নস্টালজিয়া। ইতিহাস। সম্পূর্ণ আলাদা এক যুগ যেন।
কিছু কথা জানলে মন্দ হয় না কিন্তু।
পথের পাঁচালী চলচ্চিত্রের কোন চিত্রনাট্য লেখা হয়নি। সত্যজিৎ রায়ের আঁকা ছবি ও টীকাগুলি থেকে এই চলচ্চিত্র নির্মিত হয়। তিনি ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে লন্ডনের উদ্দেশ্যে সমুদ্রযাত্রার সময় এই সকল নোটগুলি লেখেন।
অপুর পাঁচালী বইতে সত্যজিৎ লিখেছেন যে তিনি চলচ্চিত্রের প্রয়োজনে তিনি উপন্যাসের বেশ কিছু চরিত্রকে সরিয়ে দিয়েছিলেন ও গল্পটিকেও কিছুটা রদবদল করেছিলেন।
উপন্যাসের শুরুর দিকেই গ্রামের মন্দিরে সকলের সামনেই ইন্দির ঠাকরুণের মৃত্যু ঘটে, কিন্তু চলচ্চিত্রে অপু ও দুর্গা তাঁর মৃতদেহ পড়ে থাকতে দেখে। চলচ্চিত্রের অপু ও দুর্গার ট্রেন দেখার জন্য দৌড়নোর দৃশ্যটিও উপন্যাসে নেই। বর্ষায় ভিজে প্রচণ্ড জ্বর বাঁধিয়ে দুর্গার মৃত্যু ঘটে বলে চলচ্চিত্রে দেখানো হলেও উপন্যাসে মৃত্যুর কারণ অজানাই রাখা হয়েছে। হরিহর রায়ের পরিবারের গ্রাম ত্যাগ দিয়ে চলচ্চিত্র শেষ হলেও উপন্যাস সেই ভাবে শেষ হয়নি।

পথের পাঁচালী চলচ্চিত্র নির্মাণ হওয়ার আগেই কানু বন্দ্যোপাধ্যায় বাংলা চলচ্চিত্র জগতের একজন প্রতিষ্ঠিত অভিনেতা ছিলেন। সত্যজিতের বন্ধু-পত্নী করুণা বন্দ্যোপাধ্যায় একজন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের একজন অপেশাদার অভিনেত্রী ছিলেন। দুর্গার ভূমিকায় অভিনয় করার পূর্বে উমা দাশগুপ্ত কয়েকটি নাটকে অভিনয় করেছিলেন। অপুর চরিত্রে অভিনয় করার জন্য সত্যজিৎ পাঁচ থেকে সাত বছরের শিশুর সন্ধানে সংবাদপত্রে বিজ্ঞাপন দেন, কিন্তু বিজ্ঞাপনের মারফত আসা কোন ছেলেকেই তাঁর পছন্দ হয়নি। এর মধ্যেই সত্যজিতের স্ত্রী বিজয়া রায় তাঁদের বাড়ির নিকটে সুবীর বন্দ্যোপাধ্যায় নামে একটি ছেলেকে দেখেন এবং অবশেষে অপুর চরিত্রে তাঁকেই পছন্দ করা হয়। ইন্দির ঠাকরুণের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সত্যজিৎ কলকাতার নিষিদ্ধ পল্লী থেকে চুনীবালা দেবী নামক একজন পুরাতন নাট্যাভিনেত্রীকে খুঁজে বের করেন। অন্যান্য বিভিন্ন অনুল্লেখ্য চরিত্রে বড়াল গ্রামের বাসিন্দারা অভিনয় করেন।