শীর্ণ হাতদুটো দরজা খুলে দাঁড়িয়ে রইল | ওপারে দাঁড়িয়ে ‘বাবুরা‘ | কীরকম মেয়ে পছন্দ বলুন ? ....

উল্টোদিক থেকে উত্তর এল‚ আর কাউকে নয় | দরকার আপনার সঙ্গে |

বিস্মিত হয়ে গেলেন বৃদ্ধা | বয়স চার কুড়ি প্রায় | ফোকলা মুখে একগাল হাসি ।

এই সুবেশ বাবুরা তাঁর কাছে এসেছেন !কলকাতার বিখ্যাত লালবাতি এলাকায় তখন এক দীর্ঘদেহী ভাবছেন‚ পেয়েছেন তিনি পেয়েছেন |

......এতদিনে পরশপাথর পেয়েছেন | এতদিন ধরে খ্যাপার মতো খুঁজে অবশেষে পেয়েছেন সেই কাঙ্ক্ষিত পরশপাথর | পতিতালয়ের বাসিন্দা বৃদ্ধাকে বলা হল অভিনয় করতে হবে | শুনে তাঁর মনে হল শিকড় বাকড় ওঠা লোলচর্ম হাতে একবার চিমটি কেটে দেখেন | অ-ভি-ন-য় ! সে যেন গতজন্মের কথা | সে অবশ্য করতেন এককালে থিয়েটারে | ফিল্মে সুযোগ এসেছিল ১৯৩০ সালে | তখন তিনি পঞ্চান্ন বছর বয়সী মধ্যবয়সী | অভিনয় করলেন বিগ্রহ ছবিতে | তারপর সুযোগ পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পরিচালনায় ‘ নটীর পুজা‘ | সেও কার্যত এক থিয়েটার | যাকে ফিল্মবন্দি করা হয়েছিল | ১৯৩৯ সালে শেষ অভিনয় | ছবির নাম ‘ রিক্ত ‘ থিয়েটারের চুনীবালা দেবী ছবিতে এসে পার্শ্বচরিত্র হয়েই থেকে গিয়েছিলেন | অপাংক্তেয় দিন কাটছিল কলকাতার পতিতালয়ে | অন্ধকার থেকে আলোয় ফেরার জন্যই যেন জীবিত ছিলেন তিনি | রোজ কুড়ি টাকা করে পারিশ্রমিক ছিল | এর বেশি আর সম্ভব হয়নি নতুন পরিচালকের পক্ষে | ইউনিটে এমনিতেই অর্থসঙ্কট | তাঁর নিজের বীমার কাগজ পত্র‚ স্ত্রীর গয়না সব বন্ধকী | তবুও প্রিয় উপন্যাসকে সেলুলয়েডবন্দি করতে চান তিনি | অশীতিপর ইন্দির ঠাকুরণ চরিত্রের জন্য খুঁজছিলেন এমন কাউকে‚ যিনি বৃদ্ধা | কিন্তু অভিনয় জানেন | আউটডোর শ্যুটিং-এর ধকল নিতে পারবেন | মনে রাখতে পারবেন চিত্রনাট্য | নবীন কাউকে মেক আপ দিয়ে প্রবীণ সাজাতে চাননি তিনি | বহু খুঁজেও মনোমতো কাউকে পাচ্ছিলেন না যাঁকে দিয়ে ম্যানারিজম-বর্জিত অভিনয় করাতে পারবেন | শেষমেশ আর এক অভিনেত্রী রেবা দেবী বললেন পুরনো দিনের অভিনেত্রী চুনীবালা দেবীর কথা | রেবা নিজেও ওই ছবিতে অভিনয় করছিলেন ধনী জমিদার গিন্নির চরিত্রে | তাঁর দেওয়া ঠিকানায় গিয়েছিলেন পরিচালক | সঙ্গে প্রোডাকশন ম্যানেজার অনিল চৌধুরী | চুনীবালা দেবীকে দেখেই নবীন পরিচালকের মন বলল বিভূতিভূষণের ইন্দির ঠাকরুণ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে আছে | পতিতালয় থেকে আবার ক্যামেরার সামনে দাঁড়ালেন চুনীবালা | পরনে শতচ্ছিন্ন সাদা থান | পরিচালক ও ইউনিটের আশা ছাপিয়ে অভিনয় করলেন উনি | একদিন গাড়ি থেকে নামার পরে তাঁকে বলা হল‚ সেদিন মৃত্যুর দৃশ্যে অভিনয় করতে হবে | সবাই ভেবেছিল উনি হয়তো ক্ষুণ্ণ হবেন | কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে ইন্দির ঠাকরুন ওরফে চুনীবালা দেবী বললেন‚ আরে ! এ তো অভিনয় ! কিছু মনে করব কেন ? নিশ্চিন্দিপুরের‚ থুড়ি বোড়াল গ্রামের বাঁশঝাড়ের পাশে ঢলে পড়লেন ইন্দির ঠাকরুন | শোনা যায়‚ তাঁর মাথা পড়ার মুহূর্তে নিজের কোলে নিয়ে নিয়েছিলেন পরিচালক | এত স্বাভাবিক অভিনয়টুকু করার জন্যই বোধহয় জীবনভর অপেক্ষায় ছিলেন অবহেলিত অভিনেত্রী | সমান সাবলীলতায় অভিনয় করেছিলেন শেষযাত্রার দৃশ্যে | তাঁর দেহ বাঁশের খাটিয়ায় বেঁধে নিয়ে যাওয়া হল | বিশ্ব চলচ্চিত্রের ইতিহাসে লেখা হল নতুন ইতিহাস | বসল নতুন মাইলফলক | কিন্তু শ্যুটিং করার সময় তো আর অত ইতিহাস মাথায় থাকে না | তখন সবার ঘাম ছুটে গেছে | কারণ ইন্দির ঠাকরুন শট ও.কে করেও চোখ খুলছেন না | বেশ কিছুক্ষণ কসরতের পরে পিটপিট করে চোখ খুলে ফোকলা হাসিতে মুখ ভরিয়ে বললেন‚ আরে‚ বলবে তো শট হয়ে গেছে | আমি কতক্ষণ মড়া সেজে পড়ে রয়েছি ! তিন বছর শ্যুটিং চলেছিল ছবির | টাকাই যোগাড় হয় না | পরিচালকের উদ্বেগ দূর করে এই দীর্ঘ সময়ে বেশি বড় হয়ে যায়নি ইন্দির ঠাকরুনের ভাইপো ভাইঝি | দুর্গা ছিল ছবির শুরু চেহারাতেই | অপুর গলা ভাঙেনি | আর ইন্দির ঠাকরুন নিজে জীবিত ছিলেন | নইলে পথের এই অপূর্ব পাঁচালি অপঠিতই রয়ে যেত পর্দায় | বহু কাঠখড় পুড়িয়ে ছবি একদিন ক্যানবন্দি হল | মুক্তির জন্য অপেক্ষা না করে পরিচালক চুনীবালা দেবীর বাড়ি গিয়ে প্রোজেকশনে দেখালেন | বুঝতে পেরেছিলেন তাঁকে আর বেশিদিন সময় দেবেন না চুনীবালা | ১৯৫৫ সালে ২৬আগস্ট যখন মুক্তি পেল ‘পথের পাঁচালী‘‚ তার কয়েক মাস আগে চলে গেছেন অশীতিপর চুনীবালা দেবী | গল্পের দুর্গার মতো তাঁরও বাস্তবে মারণ জ্বর হয়েছিল | নিজে যে ইতিহাসের শরিক হলেন তা আর দেখা হয়ে ওঠেনি চুনীবালা দেবীর | জানা হয়নি তিনিই প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি সম্মানিত হয়েছেন বিদেশি চলচ্চিত্র উৎসবে | ম্যানিলা চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী বিবেচিত হয়েছিলেন | তখন তিনি অনেক দূরে | হরি আর বেশিদিন সময় সুযোগ দেননি | দিন পেরিয়ে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল | ছোট্ট ঘটি ডোবায় ভাসিয়ে ইন্দির ঠাকরুন চলে গিয়েছিলেন অনেক দূরে | নিশ্চিন্দিপুরের ঘন বাঁশবাগানের মাথায় যেখানে জোনাকিরা জ্বলে‚ সেখানে...