আপনি ভেবেছিলেন কোনোদিন সিনেমায় আসবেন?

আমার ভাবার মতো বয়সের আগেই আমি সিনেমায় চলে এসেছি। কাজেই আর ভাবনাচিন্তা বিশেষ করতে হয়নি।

সত্যজি‍ৎ রায় সম্পর্কে কিছু জানতেন, তাঁর ছবিতে আসার আগে?

মোটে ১৩ বছর বয়সে যেটুকু জানা যায়, তার বেশি কিছু জানতাম না। আর সে সময়ের ১৩ বছর এবং এখনকার ১৩ বছরের একটুও মিল নেই। সত্যকারের অবোধ এবং অবুঝ বলতে যা বোঝায়, তাই ছিলাম তখন।

বাড়িতে আপত্তি করেননি কেউ? সময়টা তো খুব কড়া ছিল…

নিশ্চয়ই, তখন সময় খুব কড়া ছিল। সিনেমা থিয়েটার ইত্যাদিকে খুব একটা সুনজরে দেখার রেওয়াজ ছিল না। আবার বাড়ির অতটুকু একটা মেয়ে সিনেমায় নামবে, সেটাও যথেষ্ট আপত্তির ব্যাপার ছিল। কিন্তু কেউ আপত্তি করেননি তেমন।

এই আশ্চর্য ব্যাপারটা কীভাবে সম্ভব হয়েছিল?

এটা সম্ভব হয়েছিল যে যাদুবলে, সেই যাদুর নাম সত্যজি‍ৎ রায়। তিনি নিজে এসে আমার বাবা গীতিন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে দরবার করেছিলেন, তাঁর মেয়েটিকে তিনি নিজের সিনেমায় চান।

আপনার বাবা সত্যজি‍ৎ রায়ের অনুরাগী ছিলেন?

সত্যজিতের কাজের প্রতি ভীষণ সম্মান ছিল আমার বাবার তথা আমার পরিবারের। সেটা ১৯৫৯ সালের ঘটনা। তখনও অবধি সত্যজি‍ৎবাবুর খুব বেশি কাজ কিছু পর্দায় আসেনি। তবু পথের পাঁচালী তো এসেইছে। ১৯৫৫ সালে। আর কয়েকটা কাজ। সেই সূত্রে আরও অসংখ্য অনগরাগীর মতো আমার বাবা-ও সত্যজি‍ৎ রায়ের কাজের ভক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তাই যখন তিনি নিজে এসে বললেন আমার কথা, বাবা ‘না’ বলেননি।

আর আপনার পড়াশোনা?

সেখানে প্রবল আপত্তি ছিল। আমার স্কুল থেকে স্পষ্ট বলা হয়েছিল, লেখাপড়া কিংবা সিনেমা, এ দুইয়ের মধ্যে কোনো একটাকে বেছে নিতে হবে। সিনেমার জন্য আমার রেজাল্ট খারাপ হবে, সেটা কোনোমতেই স্কুল কর্তৃপক্ষ মানবেন না। তাছাড়া স্কুলের ছাত্রী সিনেমা করলে তার প্রভাব ওই স্কুলের বাকিদের ওপরেও পড়বে। সেটাও মানা যায় না।

আপনি সেই অবস্থা সামাল দিলেন কী করে?

স্কুল ছেড়ে দিয়ে।

পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে?

পড়াশোনা নয়, স্কুল। ওই স্কুল ছাড়িয়ে একটি ইংরেজিমাধ্যম স্কুলে আমাকে ভর্তি করে দিলেন বাবা। সেই স্কুলের এক্ষ সিনেমার ব্যাপারে কোনো আপত্তি ছিল না। স্কুল পাল্টানোর সঙ্গে সঙ্গে আমার জীবনটাও পাল্টাতে লাগল।

অপুর সংসার করার সময় সিনেমার ব্যাপারে তো কিছুই জানতেন না। ভয় করেনি?

না, ভয় আমার ছিল না কখনো। আর যে ব্যাপারের গুরুত্ব তেমন বুঝি না, তাকে ভয় পাব কেন? বরং এক আশ্চর্য কৌতূহল এবং কৌতুক ছিল মনে। বাকিটা যা করিয়েছেন, মানিকবাবু।

শটের আগে কি হাতে ধরে রিহার্সাল দেওয়াতেন?

আমার ক্ষেত্রে অনেকটা স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ার ওপর জোর দিতেন। ভেতর থেকে যেটা আসে। ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিতেন গল্পের মতো করে। সেই গল্পটায় েবার অভিনয় করতে গিয়ে স্বাভাবিকভাবে তো কোনো রিঅ্যাকশন আসবেই। সেটার ওপর জোর দিতেন বেশি। তবে সেটা পছন্দ না হলে নিজের মতো করিয়ে নিতেন।

আর শটের সময়কার টেকনিক্যাল ব্যাপারগুলো কী করে বোঝাতেন?

প্রতি শটের আগে ওটাও অঙ্কের মতো বুঝিয়ে দিতেন। মুখস্থ হয়ে যেত।

আপনি যখন অপুর সংসার-এ এলেন, তখন সৌমিত্রবাবু তো অভিজ্ঞ অনেক আগেই…

তাতে কী! আমি তো অতশত বুঝতাম না। উল্টে ওনাকেই ধমক দিতাম প্রায়। দেখতাম, শটের আগে উনি নার্ভাস হচ্ছেন মাঝে মাঝে। আবার আমায় জিজ্ঞেস করছেন, আমার ভয় করছে কিনা! তখন দিব্বি বলে দিতাম, নিজের ভয় সামলান আগে। আমার কোনো ভয় নেই!

সিনেমায় যতগুলো দৃশ্য আছে, সবই কি চিত্রনাট্য অনুযায়ী করা?

কিছু স্বতঃস্ফূর্ত দৃশ্যও রাখতেন সত্যজি‍ৎবাবু। যেমন, অপর্ণাকে নিয়ে অপু তার বাড়িতে ঢুকছে, সেই সময়ের একটা কথা মনে আছে। বন্ধ দরজার ওপারে আমি আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। ওটাই প্রথম শট ছিল আমার। সৌমিত্রদা জানতে চাইলেন, ভয় করছে না তো? বললাম, না। দরজার ওপার থেকে সত্যজি‍ৎ রায় চেঁচিয়ে জানতে চাইলেন, সব ঠিক আছে? আমরা বললাম, হ্যাঁ।  তারপর দরজা খোলা হল। আমি ভেতরে পা রাখলাম। এমনিতেই তখন জানতাম না, ওইপারে ঠিক কী কী আছে। সেই অবস্থায় অবাক হয়ে পিছন ফিরে চাইলাম একবার। মানিকবাবু সঙ্গে সঙ্গে বললেন, এই লুকটা আরও একটু কন্টিনিউ হবে। আমি ভাবিনি, ওটা সিনেমায় থাকবে। কিন্তু ওটা রেখেছিলেন তিনি।

সত্যজি‍ৎ রায়ের সঙ্গে দেবী, নায়ক, অরণ্যের দিনরাত্রি এরপর। বাংলায় আর বলিউডেও প্রভূত সাফল্য। তবু কিছু অপূর্ণ আশা রয়ে গেছে কি?

আমি চারুলতা করতে চেয়েছিলাম। ভীষণ ইচ্ছে ছিল। মানিকবাবুকে বারবার বলেছিলাম। কিন্তু উনি রাজি হননি। বলেছিলেন, আমার বয়েস কম। ওই বয়সে ওই চরিত্র মানাবে না। এটা একটা বরাবরের আফশোস রয়ে গেছে। যদি আর একটু বড় হতাম তখন! অবশ্য ঘরে বাইরে-ও আমার করার কথা ছিল। মানিকবাবু বলেওছিলেন। কিন্তু পরে সে পরিকল্পনা পাল্টান উনি।

আচ্ছা, এখন যদি সত্যজি‍ৎ রায়ের কোনো ছবি রিমেক হয়, মানে তাঁকে ট্রিবিউট দেওয়ার জন্য, কোন ছবিটা আপনার পছন্দের?

কী দরকার! ওই মানের কাজকে তার জায়গায় থাকতে দিলেই তো হয়। শ্রদ্ধা জানানোর আরো অনেক রাস্তা আছে। না-ই বা হল মানিকবাবুর কোনো ছবির রিমেক!