শান্তিনিকেতনে একবার কোনো এক অনুষ্ঠানের আগে মহড়া চলছে। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ রয়েছেন তার ব্যবস্থাপনায়। চলছে নৃত্যনাট্যের মহড়া। বিকেলের দিকে সকলের মনই একটু চা-চা করে। কজনের চা হবে জানতে একজন রবীন্দ্রনাথকে দিয়েই জিজ্ঞাসা শুরু করলেন, “গুরুদেব, আপনি কি চা খাবেন?”

চির-রসিক রবীন্দ্রনাথ উত্তর করলেন, “আমি না-চা’র দলে”।

মহড়াটা তো নাচেরই হচ্ছে। তাই প্রশ্নকর্তা সঠিক বুঝতে পারলেন না। এবার ইংরেজিতে খোঁজ নিলেন, “Gurudev, will you like to have some tea?”

রবীন্দ্রনাথকে বুঝে ওঠা অত সহজ নাকি! তিনি এবারও রহস্যময় উত্তর দিলেন, “আমি No-tea’র (নটীর) দলে”।

বিশ্বভারতীর প্রাক্তনদের কাছে চা নিয়ে গুরুদেবের এই পরিহাস আজও ভীষণরকম উজ্জ্বল।

আসলে রবীন্দ্রনাথের চা-চর্চা হোক, কিংবা চায়ে পে চর্চা, বাঙালি...আর শুধু বাঙালি বা বলি কেন, তামাম ভারতবাসীর মন এই একটা জায়গাতেই বন্ধক পড়ে আছে—চা।

২৭৩৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে চিনা সম্রাট শেন নাঙের হাতে আকস্মিকভাবে চা আবিষ্কার হওয়াটা নাহয় ইতিহাস। কিন্তু আজ থেকে তিরিশ বছর আগে পুরীর সমুদ্রের ধারে বসে কলকাতার চা-মহল তৈরি হওয়ার রূপরেখাটা ভীষণভাবে বর্তমান।

ডাক্তার বাবা, ডাক্তার মা। তাঁদের মেয়ে কিনা রক্ত দেখলে গুলিয়ে ওঠেন। তবু জিনে যখন ডাক্তারি, চিকিৎসাবিদ্যায় তো নামতেই হবে। বংশগতির ধারাকে বজায় রাখতে মেয়ে হলেন পুষ্টিবিদ। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে রোগীদের অনুরোধ আর নার্সিংহোমের চাপের কাছে মাথা নোয়াতে তো পারবেন না।

নাহ। এ কাজও হল না তাঁর।

বরং আরাম করে চায়ে চুমুক দেওয়ার কাজটাই মনের মতো।

সেটা এবার কাজ নাকি? সাটা তো আয়েস। সেটা তো আড্ডা।

ভাগ্যিস তিনি নিজে চায়ে চুমুকটা দিয়েছিলেন। তাই তো শহর কলকাতা তার মনের মতো মৌতাত জমিয়ে চায়ে চুমুক দেওয়ার সুযোগটা পেল। পেল তার ধর্ম পালন করার সুযোগ।

ধর্ম?  কেন, আড্ডা। এই আড্ডাটাই তো কলকাতার প্রাণের ধর্ম।

এবার নিশ্চয়ই চেনা যাচ্ছে তিনি কে?

তিনি ডলি রায়। দেশের প্রথম মহিলা টি টেস্টার। এবার সারা পৃথিবীর প্রথম মহিলা টি-অকশনার।

ডলি’স বললেই সারা শহর মনশ্চক্ষে ধোঁয়া ওঠা চায়ের গন্ধ পায় যে।

ঠিক কতখানি অনিশ্চয়তায় শুরু করে আজ যে এতখানি নিশ্চিত কেরিয়ার তাঁর, এ নিশ্চয়ই একদিনের ফসল নয়। তার ওপর আবার তাঁর সর্বাপেক্ষা বড় প্রতিদ্বন্দ্বীর নাম যেখানে কফি হাউজ। মানুষজন গলা ভিজিয়ে আড্ডা বলতে তো একমাত্র এখানকার চেয়ার-টেবিলগুলোকেই বোঝে। অন্তত তিরিশ বছর আগে ছবিটা অবিকল সেরকম ছিল।

আর তাঁর রূপকথা? সেই কফিহাউজের মোহে মুগ্ধ বাঙালির স্বপ্নডাঙায় নির্ভেজাল একটা চায়ের দোকান খুলে ফেললেন, তাও আবার বিনা বিজ্ঞাপনে।

দু’বার চায়ের উৎসব করলেন, তাও আবার মাত্র এক টাকা প্রবেশমূল্য নিয়ে। প্রথমটায় দিনের শেষে সেই উৎসব থেকে উঠে এসেছিল ২লাখ ৫৩হাজার টাকা।

দু বারের উৎসবের একটা টাকাও তিনি নিজে নেননি। তুলে দিয়েছেন ভারত সেবাশ্রমের হাতে।

এই সাফল্যের খতিয়ানকে রূপকথা বলা ছাড়া আর কী-ই বা বলার থাকতে পারে?

কিন্তু কীভাবে সম্ভব হল এই আশ্চর্য উত্থান?

সেও এক আড্ডার মতো। মানে আড্ডা দেওয়ার মতো বই। পড়লে যেন মনে হবে ডলি রায় নিজে আড্ডা দিতে বসেছেন। কারণ ন্যারেশন যতটা, তার চেয়ে বেশি সরাসরি ইন্টারভিউ। ডলির নিজের, ডলিকে নিয়ে তাঁর দোকানের নিয়মিত আড্ডাধারীদের, তাঁরা এবার যে যার জগতে সকলেই তারকার দ্যুতি ছড়ান।

আর আড্ডা দিতে দিতেই অসংখ্য তথ্য। সেগুলোও আড্ডার মতো করেই সাজানো। বলা বাহুল্য, সবকটি তথ্যই বিশেষ এবং চা সংক্রান্ত।

ডলি’স-এর চায়ের মতোই। শুধুই চুমুক দেওয়ার নয়, বরং উপভোগ্য। যেন শিল্প। আড্ডায় কোন প্রসঙ্গ কখন এবং কেন উঠবে, তার যেমন কোনও মাপকাঠি থাকাটা অপরাধ, এই বইতেও অনায়াসে সব প্রসঙ্গ এসেছে, গেছে...কোনও অবান্তর পূর্বাপর ছাড়াই।

চয়নিকা চক্রবর্তীর লেখায় এই বইয়ের নামটাও এক অদ্ভুত আমেজের। ‘চা'র পাঁচ ছক্কা’। ব্যাটে বলে হলে হিট, নইলে হিটস্ট্রোক।

সমঝদারের হাতে পড়লে আমেজ, নইলে মেজাজি।

আসলে মেজাজটাই তো আসল রাজা। তা ছত্রে ছত্রে বোঝা যায় ঋত প্রকাশনের এই বইটি থেকে। উপরি পাওনা ঝকঝকে রঙিন আর্টপেপারে ছাপা অজস্র সব নস্টালজিয়া, থুড়ি ছবি।  

Cha'r Pnach Chhakka

চা'র পাঁচ ছক্কা

Rs.950