বেশ মনে পড়ে, পরিচালক রামগোপাল ভার্মার ভূতের সিরিজ তখন বাজার কাঁপাচ্ছে। চতুর্দিকে হিহি করে কাঁপছে সব ভয়টয়। তবুও দেখতে ছোটার বিরাম নেই। আর সিনেমা রিলিজের আগে রামগোপাল এবং তাঁর ইউনিটের তরফ থেকে পরিষ্কার করে বলে দেওয়া হত, যাঁদের হার্টের অসুখ, তাঁরা কোনোভাবেই এ ছবি দেখতে আসবেন না। যাঁদের স্নায়ু দুর্বল, তাঁরাও সিনেমা হলে আসা থেকে বিরত থাকুন।

সোজা কথা, “আসবেন না”।

শব্দদুটো মনে পড়ল আবার। নতুন করে মনে পড়ল। এতদিন বাদে। বুক ফার্মের সদ্যপ্রকাশিত ‘ভয়’ পেয়ে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা মানেই যদি ভেবে থাকেন অভিযান, নস্টালজিয়া, সরল গ্রামের সহজ জীবন কিংবা প্রকৃতি...তাহলে কিন্তু ভীষণ ভুল করবেন। এই ‘ভয় সমগ্র’-এর পাতা ওল্টানোর আগে অবধি অন্য সকলের মতো আমারও তাই ধারণা ছিল।

বিভূতিভূষণ তো! বেশ হাসতে হাসতে আস্তে আস্তে পড়ে নেওয়া যাবে। কভারের লাল দিয়ে লেখা ‘ভয়’টা শুধুই লোক টানার জন্য। এমন ধারণা, বা বলা ভালো বিশ্বাস নিয়ে পাতা ওল্টানোর শুরু।

বিভূতিভূষণ যে বিভিন্ন অতি-বাস্তব বা অ-বাস্তব, সে যাই বলুন না কেন, তাতে বিশ্বাস রাখতেন, এ খবর জানা। শুধু তাঁর গ্রামীণ পটভূমিই এ বিশ্বাসের জন্য দায়ী ছিল, তা কিন্তু নয়। খুব কম বয়সে আর আচমকা তাঁর প্রথমা স্ত্রী গত হওয়ার পর থেকেই বিভূতিভূষণ কি আরও একটু বেশি উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন! এই পৃথিবীর বাইরে আর কোনো অদৃশ্য জগতের সঙ্গে তাঁর নীরব বোঝাপড়া তৈরি হতে আরম্ভ করেছিল! সেই জগত কি তাঁর মনে ছায়া ফেলত প্রতি মুহূর্তেই!

সে কথা অবশ্য কোথাও লিখে যাননি তিনি। তবে সেই অদৃশ্য আগন্তুকদের নিয়ে তাঁর সাহিত্যগুলোয় বিশ্বাসের ছাপ বড় স্পষ্ট।

লেখকদের সবটাই কিন্তু ফিকশন নয়। মনে রাখতে হবে, বাস্তব কোথাই কিছু না কিছু থাকেই। তাদের ওপর এরপর পড়তে পাড়ে রঙের পরত। যেমন এই ‘ভয় সমগ্র’।

কোনো একটিমাত্র ভয় নেই। বরং আশ্চর্য কিছু ‘বাস্তবের’ যে নিটোল ছবি তিনি এঁকেছেন, তাকে শুধু ‘গল্প’ বলে অস্বীকার করবে, এ দুঃসাহস কার!

বরং গল্পের মধ্যে এ যে আরো এক গল্প।

লেখক নিজে কোথাও তাঁর ‘ভয়ের’ কাহিনি গ্রন্থিত করে যাননি। বরং ছড়িয়েছিটিয়ে লেখাগুলো ছিল। গ্রন্থনার কাজ প্রকাশকের। আর সে কাজ করতে গিয়ে যে যে গল্পগুলো বেছে নিয়েছেন, শিহরণে তারা কেউ কারও চেয়ে কম নয়।

সেই সঙ্গে মিশেছে লেখকের ইতিহাস-বোধ, নিসর্গ আর গভীর জীবনবোধের ছটা। বিশেষ করে নিসর্গ এখানে তাঁর চিরস্মরণীয় প্রকৃতিপ্রেম জাগায়নি। বরং এক অস্বস্তিকর গা ছমছমে দুপুর জাগিয়ে রেখেছে প্রতিটা বর্ণনায়।

কী আনেননি বিভূতিভূষণ! তান্ত্রিক মন্ত্রের বন্ধনবিদ্যা, জটিল মস্তিষ্কবিকার, নরপিশাচ কাপালিক, জিন, প্রেতচর্চার মিডিয়াম, ডাকিনী, ছায়ামূর্তি। সমস্ত কিছুই যেন বড় বেশি দৃশ্যমান, অথচ ভীষণরকম আতঙ্ক চারপাশে। প্রতিটা শব্দকে ঘিরে ঘুরে বেড়াচ্ছে বিষাক্ত কিছু নিঃশ্বাস। দম চেপে ধরা অদ্ভুত কিছু বিকার!

পড়তে গিয়ে চমকে উঠতে হয়। এ-ই বিভূতিভূষণ! ঠিক পড়ছি তো! অপু, দুর্গা, শঙ্কর, কিলিমাঞ্জারো...তারা তবে কি অন্য কোনো হাতের আঁকা ছবি! যে লেখকের মনোজগতে এমন সব অগম্য বাস্তব থাকতে পারে, সেই লেখকের হাতের ছোঁয়ায় কি করে অরণ্যের শীতল ছায়া লাভ করা যায়?

নিজের কাছে নিজেরই জাগে অনন্ত সব প্রশ্ন।

উত্তর মেলে না। মেলে এক তীব্র অস্বস্তি। পিছনটাতে কেউ দাঁড়িয়ে নেই তো! ঠিক আমার পিছনটাতে...

--------

ভয় সমগ্র

বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের

বুকফার্ম 

দাম - ২৫০ টাকা