সে এক বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে দোলার মতো খবর। যদিও অবিশ্বাসের কোনও জায়গা নেই। কারণ যুক্তি প্রমাণ সব দাখিল হয়েছে সে খবরের পক্ষে। তবুও কেন্দ্রে যেহেতু সত্যজিৎ রায়ের মতো এক আশ্চর্য নাম, তাই নড়েচড়ে বসেছে সমস্ত পাঠক...হুম, সত্যি, হয়তো তবুও... কলকাতার অন্যতম সেরা খবরের কাগজের অফিসে ফোন এবং চিঠির ঝড়।


অবশ্য অন্নদা মুন্সীর বাড়ির লোকজন এককথায় নাকচ করে দিয়েছেন সমস্ত 'ভুল'-এর অজুহাত। তাঁদের বক্তব্য, এ কাজ ইচ্ছাকৃত। ভীষণ উৎসাহের সঙ্গে যতদূর প্রমাণ জোগাড় করা যায়, সব নিয়ে তাঁরা যথাসাধ্য সাহায্য করে চলেছেন।

আর এগোনোর আগে খবরের প্রেক্ষাপটটা সামান্য একটু বুঝে নেওয়া যাক। পাগলা দাশু-র প্রথম সংস্করণে প্রচ্ছদের ছবি অন্নদা মজুমদার, পরের সংস্করণে একই প্রচ্ছদে নাম সত্যজিৎ রায়।
অন্নদা মুন্সীর বাড়ি, পরিবার, পাগলা দাশুর ছাপাখানা সিগনেট প্রেসের বর্তমান কর্তাব্যক্ত...খবরের জন্য কাউকে তোলপাড় করে তুলতে বাকি নেই।

খবর তো পুরোপুরি অন্নদা মুন্সীর দিকেই ঝুঁকে। এবার শেষ বাকি আছে রায় পরিবারের সঙ্গে কথা বলা। কিন্তু সন্দীপ বলে দিলেন, তাঁর এ বিষয়ে কিছু জানা নেই। তাহলে কে জানেন?

''মা জানতে পারেন।''

বিজয়া রায় তখনও বেঁচে। কিন্তু অসুখের ভারে বিধ্বস্ত।

''মায়ের সঙ্গে কথা বলতে পারেন, তবে দশ মিনিটের বেশি নয়। মায়ের কষ্ট হবে। যদিও আমি থাকব না, তবে আপনারা আসুন কাল। মা-কে বলে রাখছি।''

সন্দীপের অনুমতি পেয়ে পরদিন ঘড়ির কাঁটা মিলিয়ে ঠিক সময়ে সেই জাদু-পুরীতে হাজির। পরিচারক এসে বসার ঘরের পাশের ঘরটিতে বসিয়ে দিয়ে গেলেন। তার ঠিক মিনিট তিনেক পরেই ঢুকলেন তিনি। সত্যজিতের সমস্ত কাজ, ভাবনা এবং মননের সঙ্গী বিজয়া রায়। ঋজু চেতনাটিকে অসুখ গ্রাস করেছে সত্যি, তবে শৃঙ্খলা এবং স্বচ্ছতায় তিনি তাঁর পরনের কাপড়টির মতোই নিভাঁজ এবং পরিষ্কার।
অত্যন্ত ধীর, নম্র অথচ স্পষ্ট স্বরে বক্তব্য খুব সংক্ষিপ্ত কিন্তু আন্তরিক।

নানান একথা সে-কথার পর প্রসঙ্গান্তর থেকে এবার মূল বিষয়ে ফিরিয়ে এনে সব তথ্য প্রমাণ দেখিয়ে প্রশ্ন। একেবারেই সাংবাদিকসুলভ ঢঙে।

সআসলে তাঁর সঙ্গে মেলামেশা অভ্যেস নেই তো, তাই জানাও নেই তাঁর নিজস্ব স্বভাব। বয়স্ক মানুষ কত আর প্রসঙ্গের ঝাঁকুনি নেবেন? বেশি ঘোরাতে পারলেই মূল কথাটি বেরিয়ে আসবে ভেতর থেকে...এমনই একটা ধান্দা ছিল মনে মনে। কিন্তু অবাক হয়ে দেখলাম, এ মানুষ সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাতু। এ মানুষ সত্যি স্বীকারে কিছুমাত্র সময় নেন না। মিছেই এত ঘোরাঘুরি। বিজয়া রায় সব তথ্য দেখেশুনে সোজা তাকিয়ে কেটে কেটে বলে দিলেন, ''মানিকের ভুল হয়েছিল। এটা ভুল বলেই লিখবেন।''

যে খবর বেরনোর পর তার সত্যতা মানতে সাধারণ পাঠকেরই এত দ্বিধা, সেই খবরের ঘরণী এতটাই ঋজু! কাগজের খবর আর পাঠক প্রতিক্রিয়া দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, সন্দীপ কী

বলেছিলেন...''মায়ের কষ্ট হবে''! ভুল। সম্পূর্ণ ভুল। বিজয়া রায়দের কোনও কষ্ট হয় না আসলে। বয়সটা নেহাতই মায়া। এই দৃঢ়তা চিরায়ত!