মণি-মাণিক্যে জড়ানো এক সঙ্গ...

তাঁর কলকাতার এক সহকারীর থেকে মেইল আইডি-টা পাওয়া। সে কি আর এমনি দেয়? অনেক খাতির আর আব্দার জমিয়ে তবেই না সরাসরি যোগাযোগের রাস্তাটা খুলে দেয় চোখের সামনে। কিন্তু কেন যে অমন মারাত্মক চেপেচুপে ধরেছিলাম তখন, তার সঠিক কারণটাও নিজের জানা ছিল না। ওই বিশ্ববিখ্যাত মানুষটাকে ঠিক কী বলে সম্বোধন করা যায়, সে ভাবনাই ভাবিনি কোনওদিন, তো আবার আলোচনার প্রসঙ্গ উত্থাপন!

শুধু জানতাম, এক অদম্য নেশা থেকে তাঁর কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছি মাত্র। সুবিধে বলতে একটা ঐতিহ্যবাহী সংবাদপত্রের নামটা জুড়ে আছে আমার সঙ্গে তখন।ব্যস, এইটুকু মাত্র সম্বল করে বেশ গুরুগম্ভীর ভাব দেখিয়ে, নিজের সবটুকু অবুঝপনা তিলমাত্র বুঝতে না দিয়ে একদিন সরাসরি তাঁর দরজায় কড়া নাড়লাম, অবশ্যই আন্তর্জালে। কী জানতে চাইব, সে নাহয় পরে ভাবা যাবে। আগে গিয়ে তো পড়ি!

কোনও উত্তর আসতেই পারে না...এমন স্থির প্রত্যয়ে লগ আউট করে টিফিনটা সেরে এসে অফিসের কাজেই মেইলটা ফের খুলেছি। আর তখনই প্রচণ্ড এক হাইভোল্টেজ কারেন্ট। তখন তেমনই মনে হয়েছিল।

রিপ্লাই ফ্রম মণি ভৌমিক!

কয়েক সেকেন্ড স্থানু। তারপর মেইলটা খুলে পড়তে শুরু করলাম। অবিশ্বাসটা পুরোমাত্রায় চোখে, মুখে ছাপ ফেলে আছে তখনও।

খুব সংক্ষিপ্ত কিন্তু ভীষণ আন্তরিক কয়েক লাইন।

অবশ্য বলারও বিশেষ কিছু নেই। শুধু নিজের পরিচয় দিয়ে জানতে চেয়েছিলাম, তাঁকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি কিনা।

তিনি, বিশ্বের ব্যস্ততম শিক্ষক, বিজ্ঞানী, গবেষক, লেখক জবাবে বলেছেন যে, সাগ্রহে অপেক্ষা করছেন... যদি তাঁর উত্তর আমায় কিছুটা নিঃসংশয় করতে পারে, তাহলে আনন্দিত হবেন!

ড. মণি ভৌমিক সম্পর্কে বহু গল্প শুনে মিথ মনে হয়েছিল তার আগে। সেই মুহূর্তে মনে হল, দুনিয়ার সব মিথ আসলে মণি ভৌমিক-ই বোধহয়!

সত্যি কয়েকটা ভীষণ জটিল প্রশ্ন মাথায় কিলবিল করত দিনরাত। সেই প্রশ্নের কোনও বিজ্ঞানসম্মত উত্তর হতে পারে কিনা, তা জানার আকাঙ্খাও অদম্য ছিল। যদিও বিজ্ঞানের বিশেষ কিছু বুঝি না। বরাবর আর্টসের ছাত্রী। তাও বোদ্ধার মতো প্রশ্নগুলো এক দুই তিন করে লিখে ফেললাম। আর তার নীচে নিতান্তই ‘বেচারা’ টাইপের এক অনুরোধ রাখলাম, আমার বোঝার মতো করে সহজ ভাষায় যদি উত্তরগুলো দেন...

এরও জবাব আসতে পারে? তখনও মাথা বলছে ‘না’, মন বলছে ‘হ্যাঁ’। এতখানি আহাম্মকি মেইল নিশ্চয়ই মানুষটি কোনওদিন পাননি। সেগুলো আদৌ তাঁর নিরিখে প্রশ্ন কিনা, সে খবরই তো রাখা হয়নি। দুম করে পাঠিয়ে দিলাম!

এমন ভাবতে ভাবতেই ঘণ্টাখানেক কাটল। কাজে মশগুল হয়ে গেছি। হঠা‍ৎ আবার একটা মেইল। ড. ভৌমিকের থেকে। আর শুরুতেই ‘দেরির জন্য দুঃখিত’।

স্বর্গ মর্ত্য ততক্ষণে এক হয়ে যাবার যোগাড়।

এক এক করে আমার সমস্ত প্রশ্ন ধরে ভীষণ সহজ আর চলতি ভাষায়, আশপাশের উদাহরণ, তাঁর জীবনের ঘটনা ইত্যাদি দিয়ে তিনি বিশ্লেষণ করে উত্তর পাঠাচ্ছেন!

দার্শনিক তত্ত্বগুলো বিজ্ঞানের ল্যাবে ফেলে তাদের যুক্তিসিদ্ধতা বোঝাচ্ছেন!

আমার দশটা প্রশ্নের মধ্যে পাঁচটা নিয়ে দু পাতার এমন বিশদ বিশ্লেষণ পাঠিয়ে আবার মাফ চেয়েছেন, কাজের ব্যস্ততার জন্য পরেরগুলো একই সঙ্গে দিতে পারছেন না বলে।

কথা দিয়েছেন, সেগুলো পরদিনের মধ্যে পাঠিয়ে দেবেন।

পুরো অফিস করতে পারিনি, বেশ মনে আছে। বাড়ি ফিরে এসেছিলাম সময়ের অনেক আগেই।

যা কথা, তাই কাজ। পরদিন দুপুরের মধ্যেই এল তাঁর পরের মেইল। বাকি উত্তরগুলো নিয়ে। তবে তার সঙ্গে বাড়তি আরেক নোট। শুধুমাত্র মেইলে এই বিষয়গুলো বুঝিয়ে তিনি তৃপ্ত নন। সামনে কথা বলবেন, কলকাতায়।

কয়েকদিন পরই ড. মণি ভৌমিক আমেরিকা থেকে আসছেন সায়েন্সসিটিতে তাঁর বই উদ্বোধনে। জানিয়ে দিয়েছিলেন। অফিসে সেই অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ আসতেই নিয়মনীতি অবজ্ঞা করে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সেই আমন্ত্রণপত্র পকেটস্থ তো হল। এবার তাঁর থেকে আরেকবার অনুমতি নেওয়ার পালা। কথা বলবেন তো?

জবাব এল, ‘আমি নিজেই ভাবছিলাম, তুমি আসতে পারবে কিনা! এই প্রশ্নগুলো নিয়ে আলোচনা করতে আমি মুখিয়ে আছি’।

আর পায় কে! নির্দিষ্ট দিনে এক ভীষণ বর্ণাঢ্য অথচ গুরুগম্ভীর আলোচনার সকালের শেষ পর্যায়ে সায়েন্সসিটির সিঁড়িতে অসম্ভব ভিড়। তিলধারণের জায়গা নেই। সব ছাত্রছাত্রী আর কমবয়সী ছেলেমেয়েরা। ড. ভৌমিকের সঙ্গে একটিবার কথা বলতে, তাঁকে ছুঁয়ে দেখতে, তাঁকে প্রণাম করতে কী সাংঘাতিক বিহ্বলতা সকলের মুখেচোখে। সেই ভিড়ে কাতার দিয়ে আবার মিশে গেছেন তাদের অভিভাবকেরাও।

দূর থেকে সে দৃশ্য দেখে তো প্রমাদ গুনেছি। এই সমুদ্র ভেদ করে আর ডাক পৌঁছবে নাকি!

ড. ভৌমিক বেরোলেন। ঈশ্বরকে হাতের নাগালে পেলে যে উন্মত্ততা, ঠিক তেমনভাবেই ঘিরে ধরল অপেক্ষমান জনস্রোত। কোথায় উড়ে গেল পুলিশের ব্যারিকেড।

প্রায় মিনিট চল্লিশের চেষ্টায় একটু মাথা গলানো গেছে সে ভিড়ের মধ্যে। ড. ভৌমিক সকলের সঙ্গেই আলাদা করে কথা বলতে চেষ্টা করছেন। খুঁটিয়ে শুনছেন কথা। হাসছেন, মাথায় হাত বোলাচ্ছেন। অনাবিল, নিরুত্তাপ। কোনও তাড়া নেই। আর তাঁর সেক্রেটারি ক্রমাগত চেষ্টা করে যাচ্ছে তাঁকে পরের প্রোগ্রামের কথা মনে করাতে।

‘যা থাকে কপালে’ করে দূর থেকেই যথাসম্ভব গলা চড়িয়ে তাঁকে ডেকে ফেললাম। চকিতে ঘুরে তাকালেন। ওই কলরবের মধ্যেই শুধু নিজের নামটা বলতে পেরেছি।

এরপর যা ঘটল, স্বপ্নে ভাবাটাও বাতুলতা।

সমস্ত বন্ধন কাটিয়ে ত‍ৎক্ষণা‍ৎ বেরিয়ে এলেন ড. মণি ভৌমিক। পিঠে হাত রেখে একটু ফাঁকা জায়গার সন্ধানে নিজেই এদিক ওদিক খুঁজতে লাগলেন। মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাঁকে অনুসরণ করছি শুধু। আর কোনও বোধ নেই। কোনওরকমে একটা সিঁড়ি একটু ফাঁকা পেয়ে সস্নেহে বললেন, ‘তুমি হোটেলে আমার রুমে চলে এসো। আলাদা করে কথা বলতে হবে। আমি ভাবছিলাম, কথা বলা যাবে কিনা! এখানে খুব কঠিন। হোটেলে আমরা প্রাণভরে আড্ডা দেব’।

সহকারীকে ডেকে নিয়ে নিজেই স্যুট নম্বর আর টাইম দিয়ে দিতে বললেন।

তাঁর অসম্ভব ব্যস্ততার কারণে আর ফিরে যাওয়ার তাড়ায় সেই আড্ডা শেষপর্যন্ত হল দু‍’বছর বাদে।কলকাতায়। তাঁর হোটেলের সেই ঘরে।সম্ভবত নিয়ম আর সময় অতিক্রম করে কোনও আন্তর্জাতিক পুরোধা মানুষের এমন আড্ডায় বসার নজির খুব কম।

নিয়মানুযায়ী যদিও অ্যাপয়েন্টমেন্ট একার, কিন্তু হাজির হলাম দুই বন্ধুতে। আমি আর ইন্দিরা।

সময় মাত্র দশ মিনিটের। তবে শেষ অবধি তাঁর ঘর থেকে বেরোলাম ঘণ্টা দেড়েক পরে।

সারা বিশ্ব কিন্তু জানে, ড. মণি ভৌমিক এক কথার মানুষ!

আসলে কোনও কোনও শিক্ষকই বোধহয় সবচেয়ে প্রিয় বন্ধু হয়ে ওঠেন...