বই কাউকে বাঁচাতে পারে! না না, অতুল জ্ঞানরাশির কথা বলছি না। সে তো আক্ষরিক অর্থেই মানুষকে বরাবর মনুষ্যত্বের পথ দেখিয়েছে। কিন্তু না। সেই জ্ঞানের কথা বলছি না। বরং বই খাবারের যোগান দিয়েছে। পেটে খেয়ে বাঁচতে সাহায্য করেছে। তাও আবার ঘোর দুঃসময়ে। মানে যখন হাতে এক কানাকড়িও নেই।

কাকে?

এককালের এক স্বনামধন্যকে।

নাম তাঁর ভারতভূষণ। পাঁচের দশকের বিখ্যাত রুপোলি নায়ক। প্রধানত পৌরাণিক চরিত্রে অভিনয়ের সুবাদেই সে সময়ের মানুষ তাঁকে চিনত।

বরাবরের মেধাবী ছাত্র ভারতভূষণ বইপ্রেমী বললে কম বলা হয়, ছিলেন বইপোকা। বইয়ের নেশায় বানিয়ে একটু একটু করে বানিয়ে ফেলেছিলেন এক লাইব্রেরি। সে লাইব্রেরি ভরে ছিল অসংখ্য দুষ্প্রাপ্য সব বই। ব্রিটিশ ভারতের দুষ্প্রাপ্য বই মানে সহজেই অনুমেয়, পরবর্তীকালে তার কদর কতখানি।

সেই বই পড়া তাঁর এমন নেশায় দাঁড়িয়েছিল, তার খবর বন্ধুদের মুখে মুখে চাউর হতে দেরি হয়নি। তাঁকে দেখতে পর্যন্ত লোকজন আসত, আসত তাঁর সঙ্গে বই নিয়ে আলোচনা করতে।

লোকে ভেবেছিল অধ্যাপক হবেন। হয়ে গেলেন সিনেমার নায়ক। স্বাভাবিকভাবেই বাড়ির অমতে। কেরিয়ারের শুরুর দিকে বেশ কিছু ছবি মুখ থুবড়ে পড়লেও কিছু ঐতিহাসিক এবং মিথোলজিকাল চরিত্র নিয়ে একের পর এক ছবি হিট করাতে করাতে কেরিয়ারের স্বর্ণশিখরে উঠে পড়েন ভারতভূষণ।

এক দশকের কাছাকাছি দাপিয়ে অভিনয়, প্রযোজনা, চিত্রনাট্য লেখা ইত্যাদি কাজ করলেও এক সময় ক্রমশ পড়তে শুরু করে তাঁর জনপ্রিয়তা। শেষে অবস্থা এমন দাঁড়ায়, কাজ চাইতে চাইতে হন্যে হয়ে যেলেন, কিন্তু কাজ জুটত না কোথাও।

সাংসারিক জীবনও সুখের হয়নি। একসময় দারিদ্র্য আর হতাশা গ্রাস করতে করতে তাঁকে সুরাসক্ত করে তোলে। বাড়িতে খাবার নেই। পকেটে টাকা নেই। কোনো কাজও নেই।

পেশার চাপে আর তাকানোর সময় হয়নি। কিন্তু এবার নেশা আর দারিদ্র্যের তাড়নায় ভারতভূষণ আবার ফিরে চাইলেন তাঁর লাইব্রেরির দিকে। থরে থরে সাজানো অমূল্য সম্ভার। সিংহভাগ দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ। ভারতভূষণ জানেন সেগুলোর দাম এবং কদর কী হতে পারে।

শোনা যায়, সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য তাঁকে বেশ কিছু রাত বিনিদ্র কাটাতে হয়েছিল। যতই পেটে খাবার না থাক, মনের টান তো খাদ্যের চেয়েও বড়। একসময় তাঁর শুধু মগজের খাবার হলেই চলত। বই পড়তে পড়তে কেটে যেত কত বিনিদ্র রজনী।

আর এখন! পেটের তাড়নায় দিন কাটে না...রাতগুলো আরো চেপে ধরে।

তবু প্রাণে ধরে লাইব্রেরির দরজা খুলে দিতে পারেননি শুরুতে। নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ বারবার। নিজেকে বোঝানো আর পাল্টা যুক্তির পালা। আর শেষমেশ জিতে গেল অসীম দারিদ্র্য। একদিন চোখ বুজে লাইব্রেরির দরজাটা খুলে ফেললেন ভারতভূষণ। হাতে তুলে নিলেন একের পর এক কালজয়ী সব বই। তারপর নামলেন রাস্তায়।

সে সময়ে লাইব্রেরির সংখ্যাটা বেশ ভালোই ছিল। মানুষ বই পড়তে চাইত, বই পড়াটা কর্তব্যকর্ম হিসেবে গণ্য করত। আর দুষ্প্রাপ্য হলে তো কথাই নেই।

ক্রেতা পেতে দেরি হল না তাঁর। জায়গায় জায়গায় লাইব্রেরি আর সেখান থেলে আরো কিছু লাইব্রেরির খোঁজ। ষাটের দশকের শেষদিকে, সত্তরের দশকের শুরুর দিকে অনেক বিত্তবান মানুষ নিজেদের সংগ্রহে রাখতেন কিছু দুষ্প্রাপ্য সম্ভার। সেটা তাঁদের কৌলীন্যের মধ্যে পড়ত। তার জন্য উপযুক্ত দাম দিতেও পিছ-পা হতেন না তাঁরা।

তাছাড়া গবেষণার কাজ তো ছিলই। সেক্ষেত্রেও সম্ভার কিছু কম লাগে না। ভারতভূষণের ক্রেতা পেতে কোনো অসুবিধা হল না। যেচে আগ বাড়িয়ে এসে লোকে নিয়ে যেত তাঁর সংগ্রহ।

এমনি করে একটা একটা বই তাঁর একেকদিনের খাবার এবং অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের যোগান দিতে লাগল। গোটা লাইব্রেরিটা তিল তিল করে নিঃশেষ হওয়া অবধি ভারতভূষণ শরীরগতভাবে বেঁচে ছিলেন ঠিকই। তবে মনের দিক থেকে মৃত্যু হয়েছিল সেদিনই, যেদিন তিনি লাইব্রেরির দরজা খুলেছিলেন তাকে পণ্যের মূল্যে তুলবেন বলে।

নব্বইয়ের দশকের গোড়ায় তাঁর পার্থিব শরীরের মৃত্যু হয়। তবে তার আগে অবধি মোটামুটি ভারতভূষণের খাদ্য আর ওষুধের প্রয়োজন মিটিয়েছিল ওই লাইব্রেরির বই। সম্ভবত ভারতে এমন নজির আর বিশেষ নেই।