ডায়রি-গোত্রের লেখা বাংলা সাহিত্যে বেশ জনপ্রিয়। অনেকটা রোজনামচার মতো এই উপাখ্যানে পাঠকরা আন্তরিকতার স্বাদ পান। লেখকের দিনপঞ্জির সঙ্গে একাত্ম হতে পারেন। একসঙ্গে পথ চলতে পারেন। এরকম একটা অনুভূতির জন্য ডায়রি-সাহিত্য জনপ্রিয়। ঘড়ি ধরে প্রতি মিনিট সেকেন্ড চোখে দেখা যায় যেন। অথচ মনখারাপের কথা হল, এ ধরনের ডায়রি-সাহিত্যের চল খুব বেশি নেই।

তবে এ বইকে ঠিক ডায়রি-সাহিত্য বলা যাবে না। মানে, ওইটুকু বললে এর প্রতি সুবিচার করা হবে না। এ বই আসলে রোজনামচা তো বটেই, কিন্তু রোজনামচাটা দিনাতিপাতের নয়। রোজনামচা হল রোজেকার খুঁটিনাটি। তা সবসময় অভিজ্ঞতা না-ও হতে পারে। কিন্তু এই বই শুধুই অভিজ্ঞতার মণিমুক্তো। লেখক তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য এবং সম্মানজনক চাকরি আর সম্পদ হাতে নিয়ে সুখেশান্তিতে কাল কাটাতে পারতেন। কিন্তু নিশ্চিন্দি তাঁর সইল না। বরং চাকরি আর বাঁধা সময়কে ফাঁকি দিয়ে প্রায়ই চলে যেতেন পথ থেকে পথে। নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই, বরং নির্দিষ্ট লক্ষ্যকে অনির্দিষ্ট গন্তব্যে পাঠিয়ে দিতেই তাঁর পথ থেকে পথে হেঁটে চলা। কখনো সাগরে তো কখনো পাহাড়ে, কখনো মন্দিরে তো কখনো গুম্ফায়। আবার কখনো বা শ্মশানের জ্বলন্ত চিতার পাশে।

জীবন তাঁকে যেখানে যেখানে এনে ফেলেছে, সেখান থেকেই কিছু না কিছু অধ্যায় যুক্ত হয়েছে তাঁর পথে। তবে পথ কখনো আটকে যায়নি তার ভারে। বহতা নদীর মতো সমস্ত অধ্যায় বুকে করে নিয়ে তাঁর পথ এবার এগিয়ে গেছে, আরও দূর থেকে সুদূরের দিকে।

রামকৃষ্ণ দাস থেকে তিনি হয়ে উঠেছেন কর্মা জ্ঞান বজ্র রেপা। ভারতের একমাত্র বাঙালি মহাযানী যোগী লামা।

তবে তাঁর অভিজ্ঞতা যেমন অঢেল, তেমনি আশ্চর্যের। এক জীবনে এত অভিজ্ঞতা মানুষের হয় কী করে, সেও এক বড় প্রশ্ন। আর তাদের কোনো নির্দিষ্ট প্যাটার্ন নেই। যখন যেমন এসেছে, সে সবগুলোকেই বড় আদর করে গ্রহণ করেছেন তিনি। তারপর সেগুলো খুব যত্নে সাজিয়ে দিয়েছেন দুই মলাটে।

এই বইয়ের বিশেষত্ব হল, আদতে এটাও একটা পথের মতো। সমস্ত অভিজ্ঞতা জুড়ে জুড়ে তাঁর যাত্রাপথটা বেশ খুঁজে নেওয়া যায়।

ছোট ছোট করে লেখা, বর্ণনার কোনো বাহুল্য নেই। প্রতিটা ঘটনার প্রতি একইরকম সমাদর। প্রতিটা ঘটনাকেই আলাদা করে সম্মান দেওয়ার চেষ্টা। কোনো লাইনে একটিরও ঠিক-ভুল নির্ণয়ের বাড়তি গরিমা নেই। বরং প্রচ্ছদ থেকে শেষ মলাট অবধি নিরন্তর এক বয়ে চলা আছে। পড়তে পড়তে পাঠক বুঝতেই পারবেন না, ঠিক কখন তিনিও এই স্রোতের সঙ্গী হয়ে গেছেন! যতক্ষণে বুঝবেন, ততক্ষণে লামার ঝোলা থেকে তাঁর নিজের ঝোলায় বেশ কিছুটা সূর্যালোক পাওয়া হয়ে গেছে।

এই যাত্রা আদতে তো এক পরম্পরা।

 

লামার ঝোলা   

কর্মা জ্ঞান বজ্র রেপা

প্রকাশক- দ্য কাফে টেবল